সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। স্বর্গ হতে বহিস্কৃত হয়ে আদম এই বিশ্ব প্রকৃতিকে কেমন দেখেছিলেন জানি না তবে অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। চারিদিকে সুন্দর আর সুন্দরের সমারোহ। বৈচিত্র্যে ভরপুর। তারপর দেখা পেলেন হাওয়ার। হৃদয় মন আত্মা তার নেচে উঠেছিল আনন্দে। তার হৃদয় নিঃসৃত সেই শব্দ এই শূন্য পৃথিবীতে বলাকার গতির ঝংকারের মতো দিক থেকে দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই শব্দতরংগ ভাষা না হলেও,কালি কলমে লেখা না হলেও, তাই–ই সুর, তাই–ই আনন্দ,শিল্প এবং সাহিত্য। সেই সুরের ধ্বনি একদিন ভাষায় রূপ নেয়।
অযুত বরষের পরে আমরা মানুষেরা নানান ভাষায় কথা বলি, গান গাই, অলংকৃত করে সাহিত্যে রূপ দান করি। সাহিত্য কেবল কথার সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করা নয়,নান্দনিকতাই নয়,মানুষের জীবনবোধকে উপলব্ধি করা তার বিশেষ একটি দিক। সাহিত্যের প্রধান কাজ মানুষের আত্মাকে অজ্ঞানতার অন্ধকার হতে বাইরে বের করে আনা,তার উপলব্ধিকে জাগ্রত করা,ভালমন্দের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। মানুষকে সুন্দর এবং শান্তির স্বপ্ন দেখানো।
আজকের বিশ্ব যখন হতাশা, অস্থিরতা, অন্যায়, অবিচারে অশান্ত, তখন সাহিত্য মানুষকে পথ দেখায়। মানুষের এই স্বপ্ন শান্তির পক্ষে,সুন্দরের পক্ষে,অসুন্দর এবং বিনাশের বিপক্ষে। মানুষের অন্তর যখন দুঃখ কষ্টে বিষাদে ম্রিয়মান হয় তখন মানুষ আশ্রয় খোঁজে সাহিত্যে,সংগীতে এবং কবিতায়। সৌন্দর্য্য মিশ্রিত শব্দ বলেই সেটি সাহিত্য। ঐ সৌন্দর্য্য মিশ্রনই শিল্প। সেদিক থেকে কথাশিল্পী একজন সাহিত্যিক।
শিল্পবোধের স্থান মানুষের মনে। রসবোধ না থাকলে শিল্প সৃষ্টি হয় না। ভাবনাকে ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে সঞ্চারিত করাই সাহিত্য চর্চা। মানুষ মাত্রেই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সুখ ও সৌন্দর্য্যের অনুভূতির পরশ পায়। সেই অনুভূতির প্রকাশ করবার অভিলাষ তাদের আছে। কেউ কেউ অনায়াসে মনের ভাব সৌন্দর্য্য রসে জারিত করে প্রকাশ করে। অনেকেই সাধনা করে হৃদয়ের শিল্পমন্ডিত ভাব প্রকাশ করেন। আমরা পাঠকগণ, সেই সব বাক্য বা সাহিত্য পাঠ করে আমাদের অন্তরের না বলা কথার বহিঃপ্রকাশ দেখে আনন্দ লাভ করি। নিজেকে নির্ভার মনে করি।
‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইলো না কেহ।’ না শুধালেও আমরা সাহিত্যের মাধ্যমে সেই শৈল্পিক রস বোধের আস্বাদ পাই – তখন নিজেকে ধন্য মনে করি। মনে করি যা বলতে চেয়েছিলাম, তা এই সাহিত্যের মাধ্যমে ব্যক্ত হয়েছে।
‘সপ্তর্ষি’একটি সংকলন। নানারকম বিষয় বস্তু এই বইটির প্রান সঞ্চার করেছে। এই গ্রন্থটিতে সাতজন লেখকের অবদান রয়েছে। সুন্দর সুন্দর ভাবনা,বাস্তব জীবনের কথা তারা লিপিবদ্ধ করেছেন গদ্য,পদ্য,শায়েরী ও প্রবন্ধ আকারে। তাদের জীবন দর্শন ও অভিজ্ঞতা এই সংকলনের শ্রী বৃদ্ধি করেছে। এই সাতজন লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি,উপলব্ধি,সৃজনশীল প্রকাশ ভঙ্গি প্রশংসার দাবীদার।
সাহিত্য চর্চা যারা করেন তারা ‘সুমনা।’ সৎ চিন্তা, সৎ কর্ম, সৎ দৃষ্টি ভঙ্গির উপর নির্ভর করে তারা লেখনী ধারণ করেন। নিজেদের হৃদয়ের কথা – সুখের হোক,দুঃখের হোক,প্রকাশ করে শান্তি লাভ করেন। অন্যদিকে পাঠককেও বাস্তব জীবনের কঠিন পরিস্থিতি থেকে ক্ষণিকের জন্য হলেও বের করে আনতে সক্ষম হন। মানুষ শান্তি চায়। শান্তিই বিরাম। শান্তিই অন্তরকে শীতল রাখে, জীবনকে সুখময় অনুভূতির স্পর্শ দান করে, নব আনন্দে,নতুন ছন্দে জীবন যাপনের চাবিকাঠি খুঁজে পায়।
এই সংকলনের সাতটি নক্ষত্র তাদের আলোর বিচ্ছুরণে পাঠকদের আলোকিত করবেন এই আশা রাখি। পাঠকগণও নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করবেন। আনন্দ ও সমৃদ্ধি জীবনের কাংখিত বস্তু। এই গ্রন্থটিতে ৭২টি রচনা স্থান পেয়েছে। অনেক ঘটনা বহুল বাস্তব জীবনের কথা পাঠক হৃদয়কে আন্দোলিত করবে। তাই কম্পিত হস্তে পাঠকদের কাছে ‘সপ্তর্ষি’ গ্রন্থটি সমর্পণ করলাম। আপনাদের ভাল লাগাই আমাদের এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।
ফিরোজা হারুন
১৪ই সেপ্টেম্বর ২০২৩
৩০শে ভাদ্র,১৪৩০