Saturday, June 27, 2026

গল্প - আবর্তন

পৃথিবীর প্রতিটি জিনিসই প্রথমে দুর্বল হয়ে জন্মায়। তারপর ক্রমে তার শক্তির বিকাশ হয়। পুনরায় সে শক্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তেমনি প্রতিদিন সূর্যও ভূ–গোলকের একটি স্থানে সূচিভেদ্য অন্ধকারকে তাড়িয়ে তার কোমল আলোর পরশে প্রাণিজগতের ঘুম ভেঙ্গে দেয়। ক্রমে তার আলো বা তাপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষকেও সে কর্মচঞ্চল করে তোলে। আবার ঢলে পড়ে, ক্লান্তিতে, পশ্চিম দিগন্তে। হয়ত বা বিশ্রাম নেবার উদ্দেশ্যে। তখন মানুষেরাও ক্লান্ত হয়ে আশ্রয় নেয় তাদের নিরালা শান্তিময় বিরাম কুঞ্জে। তেমনি সেদিনও সূর্যি মামা সারাদিন তার নিয়মিত কাজ সেরে দিনান্তে আশ্রয় নিতে চাচ্ছে। তার রক্তিম আভাটুকু তখনও ধরণীর বুক থেকে মুছে যায়নি। তার রশ্মিগুলো তির্যক ভাবে ধরণীর দিকে তাকিয়ে আছে। হয়ত বা বিদায়ের করুণ ব্যথাই তার বুকে বড় হয়ে বাজছে। এমনি পরিবেশে দ্বিতলের একটি কামরায় বসে ডা. রাশেদ যার ডাকনাম ফুল, মুক্ত বাতায়ন পথে সে চেয়ে আছে মহাশূন্যে। তার দৃষ্টি যেন অসীম অনন্তকে ছাড়িয়ে একটি মাত্র বিন্দুকে লক্ষ্য করছে। তাহলে বুঝা যাচ্ছে সে কোন একটি বিষয় গভীরভাবে চিন্তা করছে। সে হয়ত তার অতীত স্মৃতিকে রোমন্থন করছে –অমৃত লাভের সন্ধানে। কিন্তু তার ভাগ্যে অমৃত উঠবে না গরল উঠবে তা কে জানে?

ফুল আজ সারাদিন কিভাবে কাটালো? 

এই একটি দিনই তার জীবনের চরম মুহূর্ত নিয়ে অপেক্ষা করছিল। মনে পড়ে তার সকালের কথা। জরুরী ডাক পড়েছিল হাসপাতালে। তার নতুন চাকুরি। তবুও লোকের কাছে অল্পদিনেই পরিচিত হয়ে উঠেছে,লোকের আকর্ষণের বস্তু হয়ে উঠেছে। সে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল হাসপাতালে। একখানি লতানো দেহ বিপরীত দিকে মুখ করে শুয়ে আছে ‘বেড’ –এ । বুঝা গেল রোগী একজন নারী। ডা. ফুল রোগিনীর সামনের দিকে গেল।। সে রোগিনীর শীর্ণ হাতখানি ধরে ঘড়িতে হৃৎস্পন্দন দেখলো। তারপর মুখের দিকে তাকালো। তখন লক্ষ্য করলে দেখা যেতো ফুলের মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তার হৃৎপিন্ড খুব দ্রুত রক্ত সঞ্চালন করছে। মৃত্যু যেন তাকেই পেয়ে বসেছে। এমনি তার ভাবখানা। মুহূর্তে সে নিজেকে সামলে নিয়ে কর্তব্য কাজে মন দিল। বোধহয় তার সারাজীবনের ডাক্তারী বিদ্যা আজ কাজে লাগিয়ে এই অকাল মৃত্যুর গ্রাস হতে রোগিনীকে রক্ষা করতে হবে। কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে ফুল বুঝতে পারলো চেষ্টা বৃথাই মাত্র। আশা নেই। প্রদীপে তৈল নেই। তবুও সে হাল ছেড়ে দিল না। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। এসব চিন্তা করে সে একটি ইনজেকশান দিল। একটু পরেই রোগিনী চোখ মেলে চাইলো। কিন্তু তার দৃষ্টি পলকহীন ভাবে পড়ে আছে ফুলের মুখের উপর। তার ভাব দেখে মনে হলো সে যেন কি সুখের মরণ মরতে যাচ্ছে। সকলেই ভাবছে এই দৃষ্টির অর্থ নেই। কিন্তু ডাক্তার বুঝতে পেরেছে এই দৃষ্টির অর্থ। তারপর রোগিনী অতি কষ্টে মৃদুস্বরে উচ্চারণ করলো, 

-‘ফুল।’ 

কেউ বুঝতে পারছিল না তার কথা কেবল মাত্র ডাক্তার ছাড়া। 

-‘চলে যাচ্ছি চিরতরে আমার প্রিয় পৃথিবী ছেড়ে। চলে যাওয়াই উচিত। আরো আগেই যেতে হতো। তবে আজ বড় সুখ পেলাম। সে সুখ মৃত্যু যন্ত্রণাকেও জয় করেছে। দুঃখ করো না এভাবে তোমার সঙ্গে দেখা হলো বলে।’ 

শেষের কথাগুলো ভাল বুঝা গেলনা। ডাক্তারের নিষেধ সত্ত্বেও সে তার শেষ কথা বোধ হয় ডাক্তারকে শুনিয়ে গেল। তার কথা বলার শক্তি ধীরে ধীরে শেষ হয়ে এলো। মেয়েটি সুবোধ বালিকার মত শান্ত হয়ে এলো মেয়েটির স্বামী,আত্মীয়,পরিজন যারা কাছে ছিল, তারা সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সবাই ডাক্তারকে আঁকড়ে ধরতে চায়। কিন্তু ডাক্তার নিরুত্তর। বহু কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক রাখে। মেয়েটি অত্যাধিক চঞ্চল হয়ে উঠলো। কি একটা বললো বোধগম্য হল না। সে তার নিঃশেষিত শক্তির সমস্তটুকু দিয়ে ডাক্তারের হাত ধরে থাকলো। ক্রমে সে নিস্তেজ হলো। তার শিথিল হয়ে যাওয়া হাত খুলে গেল। ডাক্তার আবারও তার নাড়ি দেখলো। উদাস দৃষ্টি মেলে আত্মীয়দের দিকে তাকালো। তাকে আস্তে আস্তে যত্নের সঙ্গে শুইয়ে দিল। তারপর দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আরও দ্রুত পদ সঞ্চালন করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডক্টর্স্ কোয়ার্টাসে তার কামরায় পৌঁছে গেল। তখন দেয়াল ঘড়ি ঘোষণা দিল ঢং ঢং ঢং। ফুল এতক্ষণ পর হাত ঘড়ির দিকে তাকালো। দেখলো সত্যি তিনটা বাজে। সে বসে বসে ভাবতে থাকে তার অতীতকে।        

সময় মানুষের জীবনকে কত বদলে দেয়। মনে পড়ে একসময়ে মালা আর ফুলদের বাসা ছিল পাশাপাশি। প্রথমে পরিচয়,পরে বন্ধুত্ব। তারপর আরো কিছু। দুজন –দুজনকে ভালবাসতো নিবিড় করে গভীর ভাবে। স্কুলের সময় ছাড়া তারা একই সঙ্গে থাকতো। তারা যেমন সরল ছিল, সবাই তাদের সরল চোখেই দেখতো। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্ব গাঢ় হলো,ভালবাসা প্রেমে পরিণত হতে চললো। কিন্তু তাদের চারপাশ তাদের এই মেলামেশা আর সহজ ভাবে মেনে নিতে পারলো না। চারিদিক থেকে এলো বাধা। সব্বাই বললো, ‘পরিণাম খারাপ হবে। দুজনেই সরে পড়।’

মালার স্কুল জীবন সাঙ্গ হলো। বাধ্য হয়ে তাকে সরে পড়তে হলো। দুজনেই দুই শহরের কলেজে ভর্তি হলো। দুজনে দুজনের চোখের আড়াল হলো বটে,তবে মনের আড়াল হতে পারলো না। পরস্পরেরে আকর্ষণ প্রবল হলো। এরপর আরো বহু বাধা এসেছে। এমনকি পত্রালাপও বন্ধ হয়েছে। মনে পড়ে মালার শেষ চিঠির কথা। সে চিঠিটা সে ‘কাবুলীওয়ালা’-র মত সঙ্গেই রাখে। তার মানিব্যাগের ভেতর ওটা স্থান পেয়েছে। সেই চিঠিটা সে বের করে ফেললো। কম্পিত হস্তে সে খুলে ফেললো চিঠিটা। 

প্রিয় ফুল,

 তোমার চিঠি পেলাম। আর হ্য়তো তোমার লেখা আমার হস্তগত হবে না। তোমার চিঠি পেয়ে খুশী হয়েছি না দুঃখিত হয়েছি বলতে পারবো না। তোমার চিঠি না পেলেও শেষ বারের মতো এই চিঠি আমি লিখতাম। কিন্তু কি লিখবো বলতো? আজ যে আমার জীবনের চরম দিন উপস্থিত হয়েছে। এত যত্নে, এত সাধে গড়া সুখের জীবনের কল্পনা আজ মাটি হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে জগতের প্রতিটি পদার্থ এমনকি অপদার্থরাও আমাকে বিদ্রূপ করছে। আমি চলেছি যন্ত্রচালিতের ন্যায়, অনুভূতিহীন। আমার উপর চলছে সামরিক শাসন। হঠাৎ মানুষগুলো কেমন বদলে গেল। তাদেরকে বড় অচেনা মনে হচ্ছে আমার। কেউ আমার আপন নয়। তুমি বিশ্বাস করছো কিনা জানি না। 

তুমি লিখেছ,‘দীর্ঘকাল ধরে প্রতি মুহূর্তে ফুলে ফুলে যে মালা তুমি রচনা করেছ,সেটা ছিঁড়ে ফেল। নতুন করে মালা তৈরী করে তোমার প্রিয়তমের গলায় পরিয়ে দিও। মানাবে ভাল। আমাদের ফেলে আসা অতীতকে মনের কোণে ভিড় জমাতে দিও না। আর তাছাড়া আতীত এত বোকা নয়,সেও ভিড় করতে আসবে না। অর্থাৎ তার আর সেখানে ঠাঁই হবে না। সাবধানে থেকো। অতীত যদি মনের পর্দা উন্মোচন করে আসেও তাকে অতি গোপনে তাড়িয়ে দিও। প্রতিবাদ জানাবে না। আদর্শ গৃহিনী হও। তোমার প্রিয়তম ভাগ্যবান হউন।’


তুমি যা লিখেছ সেজন্য তোমাকে প্রতিঘাত করতে চাইনা। সমাজ সংসারের যে নিয়ম,তুমি তাই অনুসরণ করেছ। তুমি আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পার নাই বা চেষ্টাও কর নাই। তবুও জেনে রেখ, জীবনের প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিদিন তিলে তিলে সমস্ত অনুভূতি দিয়ে ‘ফুলে ফুলে যে মালা’আমি রচনা করেছি,সে মালা আমি তোমাকেই পরিয়ে দিয়েছি। সে মালা পাওয়ার মত ভাগ্যবান অন্য কেউ নেই। হয়তো ভাববে,নেহাৎ মেয়েলী মনের ক্ষণিকের আকুল আবেদন। কিন্তু জেনো আমার মন চিরকাল তোমার জন্যই উন্মুখ হয়ে থাকবে, হয়তো শেষ মিলনের জন্য। আর জেনো একটি মাত্র গ্লাসে সেই আয়তনের দু’গ্লাস জল ধরে না। তোমাকে আর কি বুঝাবো? আজ বাংলাদেশের মেয়েরা গৃহলক্ষী, খুব বাধ্য মেয়ে, একথাই প্রমাণ করতে যাচ্ছি। কিন্তু একটা কথা আছেনা, মেয়েরা ছলনাময়ী। আমি হব তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বলতে লজ্জা নেই, কেননা আমি করতে যাচ্ছি অভিনয়। কেবল অভিনয়। শুধু ফাঁকির বোঝা বয়ে বেড়াবো। অন্তরে অন্তরে পুড়ে ছাই হয়ে যাবো সেই চারুদত্ত আধারকারের মতো। আমি নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে চাই। তবে বিধাতার নিকট আমার প্রার্থনা আমি যেন জীবনের শেষ ক্ষণে তোমার সাক্ষাৎ পাই। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই।

এটাই আমার শেষ চিঠি। পরম লগ্ন তার বিভিষীকাময় আকুতি নিয়ে কঠিন হাতে লৌহ শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলার জন্য এগিয়ে আসছে। শেষবারের মতো ক্ষমা চাইছি। আর শেষবারের মতো তোমার জন্য রইলো – চিরকাল যা দিয়ে এসেছি – হৃদয় নিংড়ানো প্রীতি, বুক ভরা ভালবাসা। উপহাস করো না লক্ষীটি। তুমি সুখে থেকো ভালো থেকো।

                                  ইতি –  

                             তোমারই মালা

কুমুদিনী কলেজ,টাঙ্গাইল

০৫.০৪.১৯৫৯


Saturday, June 20, 2026

গল্প - কত অজানারে

 ফারাহ্‌ দিবা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। এম. এ. ফাইনাল দিবে। এই সময় একদিন রেডিওতে একটি বিশেষ ঘোষণা শুনতে পায়। সোমালিয়ান দস্যু কর্তৃক শ্রীলংকার বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাই। বুকটা কেঁপে উঠলো। কারণ এই জাহাজে ছয়জন বাঙ্গালী তরুণ অফিসার আছেন। তাদের মধ্যে একজন ইমরান। গত চারবছর ধরে সে তার অন্তরঙ্গ বন্ধু। কিংবা তার চাইতেও অধিক কিছু। সে একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে। তবে মেলামেশা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তার আশেপাশে।  

পারস্য উপসাগরকে লোকে গালফ্‌ বলেই জানে। সাধারণত এখানেই ভিনদেশি বাণিজ্য জাহাজগুলি জলদস্যু কবলিত হয়। কৃষ্ণকায়া সোমালিয়ান দুর্ধর্ষ দস্যুরা – যাদের  হাতে থাকে অতি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এ. কে.ফরটি সেভেন রাইফেল, তাদের সঙ্গে লড়াই করবার সাহস কারো নেই। মাত্র কয়েকজন জলদস্যু অনেক লোকজন সহ বিরাট বিরাট জাহাজ আটক করে ফেলে। আক্‌শি বাঁধা মোটা রশি জাহাজের উপরে বিশেষ কায়দায় ছুঁড়ে মারে।রাস্তা তৈরী হয়ে যায়। পরে গান পয়েন্ট তাক করে জাহাজের উপরে উঠে আসে। দিনের পর দিন জাহাজের লোকজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, খুন অনাহারে রাখা, পিপাসায় রাখা ইত্যাদি নানাবিধ অত্যাচার করে তাদের জীবন প্রদীপ নিবু নিবু পর্যায়ে নিয়ে আসে। জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে পড়ে আসহায়। ক্যাপ্টেনের মাধ্যমে শুরু করে জাহাজের মালিকের সঙ্গে দর কষাকষি। জাহজ মালিক এক পর্যায়ে মোটা অংকের মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হয়।জিম্মিরা মুক্ত হয়। প্রানে রক্ষা পায় বটে, তবে জীবনের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।    

ফারাহ্‌ দিবা একা একা এই কষ্ট সহ্য করতে পারছিল না। একদিন বাসায় তার মনোবেদনার কথা প্রকাশ করে। সকলের সহমর্মিতা পায়। জাহাজ ছিনতাই এবং সংবাদ শোনার জন্য সকলে সর্বদা উৎকর্ণ হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখে মুক্তিপণ নিয়ে দরদাম হচ্ছে। শত কোটি মুদ্রা পেলে জলদস্যুরা জাহাজ ছেড়ে দেবে। সংকোচ পরিহার করে ফারাহ্‌ ইমরানদের বাসায় যোগাযোগ করে। তারাও ইমরানের জন্য গভীর ব্যাকুলতা প্রকাশ করে। কিন্তু কোন খবরই আসছে না। ফারাহ্‌ দিবার দিনরাত্রি প্রচন্ড যন্ত্রণায় অতিবাহিত হতে থাকে। সর্বদা ইমরানের দেওয়া আংটি তার অনামিকায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। কার্জন হলের পুকুরের শান বাঁধানো ঘাটে বসে একদিন চৈত্রের বিকেলের উতল হাওয়ায় মনের আনন্দে তারা দুজনে তাদের অংগুরীয় বদল করে ফেলেছিল। ইমরানের অনামিকার আংটি ফারাহ্‌র মধ্যমায় আর তার মধ্যমার আংটি, যার উপর এফ অক্ষর মিনা করা, ইমরানের অনামিকায় বদলী হয়ে গেল। দু’জনে একসংগে গেয়ে উঠলো –

  ‘ভালবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে/

  মনে ক'রে সখী, বাঁধিয়া রাখিয়ো আমার হাতের রাখী—তোমার কনককঙ্কণে॥’ 

গান শেষে ওরা বলেছিল, এই –ই ভাল। আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন কি? চল যাই চাংপাই। চাংপাই রেস্টুরেন্টে দুজনে মুখোমুখি বসে চায়নীজ খাদ্য উপভোগ করে তাদের অলিখিত বন্ধন পাকা করে নিয়েছিল। তারপর থেকে দেখা হলেই দুজনে আংটির সংঘর্ষ করে নিতো। মজা পেত খুব। ঐ পুকুর ঘাট ছিল তাদের বৃন্দাবন। 

পুকুরের জলে পা ডুবিয়ে মন্দ মধুর হাওয়ায় দোল খেয়ে, রবি ঠাকুরের গান গেয়ে, তাদের প্রণয় দৃঢ়তা লাভ করে। একজন বিহনে আরেক জনের জীবন অর্থহীন মনে হয়। সেই প্রিয় মানুষটি আজ দূরদেশে কোন্‌ সাগরের জলে দস্যু কবলিত। হায়রে অদৃষ্ট! মানুষের জীবনে দুর্ভোগ কত ভাবেই না আসে। একসময়ে শুকিয়ে যায় চোখের জল। দুই পরিবারে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। 

হঠাৎ একদিন রেডিও মারফত জানতে পারে শতকোটি টাকার বিনিময়ে জিম্মিরা মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু ইমরান ফিরে এলো না। কেউ তার খবর  দিতে পারলো না। সময় গড়িয়ে গেল। মাস গেল, বছর গেল। সংবাদ সংগ্রহের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। রেড ক্রসও কোন খবর দিতে পারলো না। হতাশাই দুই পরিবারের সম্বল হলো। 

ফারাহ্‌ দিবা চাকুরী করছিল কলেজে। তার মা –বাবা  মেয়ের জন্য  উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। মেয়েকে সংসার গ্রহণ করবার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। ‘মানুষ একা থাকতে পারে না। কার জন্য অপেক্ষা করছ? সময় থাকতে নিজের পথ দেখ। মানুষের  নিজের আশ্রয় এবং অবলম্বন থাকা উচিত।’

এদিকে একই কলেজে এক ভদ্রলোক চাকুরি করেন। জীব বিজ্ঞানের প্রফেসর। বড্ড গম্ভীর। তারও জীবনের ইতিহাস আছে। একটি মেয়েকে তার ও খুব পছন্দ ছিল। সদা হাসি খুশী টিংকু। রঙ্গিন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায়। ইকরাম স্যারকে তার খুব ভাল লাগে। স্যারকে সে বন্ধুর মতো মনে করে। চঞ্চল চপল টিংকু তার হৃদয় –মন জয় করে নিয়েছে। তবে সে চালাকও বটে। ইকরামের পক্ষপুটে থেকে অন্য ফুলের মধুও আহরণ করে। চেখে দেখে কোনটা বেশী মিষ্টি। তাদে সঙ্গে অভিসারে যায় সুন্দর সুন্দর স্পটে। ইকরামকে তার আনন্দের কথা, আহ্লাদের কথা কিছু কিছু বলে। ইকরাম তার সততার মূল্য দেয়। ভাবে মেয়েটি খুব সরল, ছেলে মানুষ!

একদিন হাসতে হাসতে টিংকু তার বিয়ের খবর জানায় ইকরামকে। বাবা –মার প্রচন্ড আগ্রহ উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। কারণ সে তাদের একমাত্র কন্যা সন্তান। ইকরাম লজ্জার মাথা খেয়ে বলে, পাত্র হিসেবে আমি কম কিসে? ত্বরিত উত্তর দেয় টিংকু। বাবা –মার অবাধ্য হওয়া যায় না। তবে আমি তোমারই থাকবো চিরকাল। এটা তুমি সত্য বলে জেনো। মানুষের অন্তরের প্রাপ্তিই আসল। এ বলে মায়া কান্না জুড়ে দিল। 

এই ছেলেটির কথা টিংকু অনেকবার বলেছে। এটা ছিল তার শেষ খেলা। কিন্তু তবুও ইকরাম ভয়ংকর মনোবিকলনের শিকার হয়। এ কলেজের চাকুরী ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কলিগরা তাকে বাধা প্রদান করে। বলে কোথায় যাবে তুমি? কার জন্য? মানুষ সব কিছু থেকে দূরে চলে যেতে পারে। কেবল পারে না নিজের কাছ থেকে দূরে থাকতে। সুতরাং কোথাও যাবে না। আমাদের কাছে থাক। কষ্ট শেয়ার করবার লোক পাবে। তোমার সংগে যা ঘটেছে তা পরোক্ষে ভালই হয়েছে। তোমার ঘরে যখন তোমার তথাকথিত প্রিয়া অন্য ফুলের মধু আহরণ করতো, তখন ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা দাঁড়াত। সবকিছুরই একটা অন্তরর্নিহিত মঙ্গল আছে। সুতরাং যেও না কোথাও, এখানে থাক। 

ইকরাম থেকে গেল। পরিচয় ছিল কলিগ হিসাবে ফারাহ্‌ দিবার সঙ্গে। গল্প  করতে করতে দুজন দুজনার জীবনের ট্র্যাজিডির কথা জানতে পারে। অন্যরা তো জানেই। তারা সকলে মিলে একদিন এই দুই ব্যক্তিকে ধরে বসে। বলে, আমাদের কলেজে কলিগদের মধ্যে কেউ একা নেই। কেবল তোমরা দুজনে সিঙ্গল। দুজনেই চূড়ান্ত ভাল মানুষ। এবার আর কোন কথা নয়। সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হও। উদ্বাহের বন্ধনের আয়োজন করি আমরা। শীঘ্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর। 

কয়েকদিন পর কলিগরা আবার টিফিন পিরিয়ডের ধূমায়িত চায়ের উপর তাদের মতামত জানতে চাইল। তাদের অধোবদন, হাসিমুখ। সকলে ধরে নিল মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ। 

তারা দুই পরিবারের গার্জিয়ানদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিয়ের দিন তারিখ ধার্য্য করে ফেলল। ইকরাম আর ফারাহ্‌ দিবা পবিত্র সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হলো। যাত্রা শুরু হলো একটি সুন্দর সাবলীল সংসারের। মানুষের জীবন একটাই। তাকে সার্থক  করে তুলতে হলে একজন আরেকজনের দুখের সুখের সঙ্গী হতে হবে। দু’জন পরস্পরকে গ্রহণ করতে হবে ‘ভাল মন্দ মিলায়ে সকলি।’ আনন্দ, উৎসব, অনুষ্ঠান সবই হলো প্রথানুযায়ী।

দিন চলে যায় নদীর স্রোতের প্রায়। ফারাহ্‌ দিবার দুটি ছেলেমেয়ে। তারা স্কুলে যায় । এমন সময় একদিন ফারাহ্‌ ডি. ভি. পেল। আমেরিকা যাওয়ার ছাড়পত্র। অনেক চিন্তা ভাবনা করে একদিন ওরা পাড়ি জমাল আমেরিকায়। ওরা যেহেতু শিক্ষিত, সেজন্য চাকুরী পেতে অসুবিধা হয়নি। ছেলে মেয়েদেরকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। দেশেও ওরা ইংলিশ মিডিউয়াম স্কুলে পড়াশুনা করছিল। 

বেশ কিছু বছর ওদের এভাবেই কেটে গেল। একবার একটি ভাল চাকুরীর সন্ধান পায় ফারাহ্‌। সব ফরমালিটি পুরা করে সামনা সামনি সাক্ষাত্‌কার দেবার প্রয়োজন পড়ে। ফারাহ্‌ দিবা হাজির হলো সে অফিসে। রিসেপশানে বসা লোকটিকে দেখে মনে হলো ভারতীয়। একটু পর মুখ তুলে লোকটি তাকিয়ে থাকলো ফারাহ্‌ দিবার দিকে। ফারাহ্‌ -ও বিস্ফারিত নেত্রে লোকটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। হঠাত্‌ লোকটি ব্যগ্রস্বরে বলে উঠলো – তুমি? আমি ইমরান।

একটি সূক্ষ্ম যন্ত্রণা এতকাল পরে বক্ষমাঝে আর্তনাদ করে উঠলো। মনটাকে শক্ত করে বেঁধে দ্রুত অফিস কক্ষ হতে নিষ্ক্রান্ত হলো। মনে হলো আজ সে বড্ড ক্লান্ত। হৃদয় কন্দরে বেজে উঠলো সেই সুর –ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু...। 


Saturday, June 13, 2026

গল্প - জীবনের বাঁকে

শেষ পর্যন্ত মালিহার পোস্টিং অর্ডার এলো। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এক পল্লী গ্রামের কলেজে। মালিহা ইচ্ছে করেই এরকম একটি অদ্ভুত স্থানে চলে এলো। এই কলেজে কয়েকটি মাত্র মেয়ে পড়ে। আর বাকী ছাত্ররা সব আশে পাশের কয়েক গ্রামের। মেয়েদের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ কম্পাউন্ডের ভেতরেই দু’টি রুম নির্দিষ্ট করে রেখেছে। সেই মেয়েদের কামরাতেই মালিহার থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এ কলেজটি সরকারি কলেজ। অনেক সুযোগ দিয়েছে সরকার। কিন্তু শিক্ষকের বড়ই অভাব। এই পাড়াগাঁয়ে কেউ থাকতে চায় না। মালিহার মন্দ লাগে না। গ্রামীণ পরিবেশ। গাছপালার মর্মর ধ্বনি, চারিদিকে সবুজ শ্যামল শস্যক্ষেত্র। অনেকে ভাবে এ মহিলা এখানে কেন? কিন্তু কেউ জানে না মালিহা তার পরিচিত জগৎ থেকে পালিয়ে এসেছে। 

কাজে দক্ষ বলে মালিহাকে সকলে সমীহ করে। এখানে একজন অংকের প্রফেসর আছেন, তিনি অন্য কোথাও যাওয়ার জন্য তদবীর করেন না। তিনি কলেজের জন্য খুব পরিশ্রম করেন। কলেজে প্রিন্সিপাল, ভাইস প্রিন্সিপাল নেই।। কারণ এখানে শহরের কোলাহল নেই, বিজলী বাতির চমক নেই। সেই কাক ডাকা ভোরে মালিহার ঘুম ভেঙ্গে যায়। ঘুরে ঘুরে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে। ‘ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে’- দিনের সূর্যোদয় দেখে। আর দেখা হয়, ‘একটি ধানের শীষের উপরে একটি শিশির বিন্দু!’

কালক্রমে দেখা যায় অংক স্যার নাসিরুদ্দিন আর মালিহাই কলেজ চালান। অন্য বিষয়ও তাদেরকে পড়াতে হয়। শিক্ষক যায় বদলি হয়ে, নতুন শিক্ষক আসে। ছাত্র ছাত্রীরা পরীক্ষা দিয়ে চলে যায়, নতুন ছাত্র ছাত্রী আসে। স্থায়ী থাকে দু’জন মাত্র। মালিহা আপা, নাসিরুদ্দিন স্যার। স্বাভাবিক ভাবেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। 

মজার বিষয় এরা দুজন দুজনকে চেনে। কিন্তু পরিচয় জানে না। একদিন নাসিরুদ্দিন বললেন, আপা, আপনার পরিচয় জানা হয়নি। মালিহা বলেন, পরিচয় আমার আহামরি কিছু নয়। ঐ চাকুরীর খাতায় যা লেখা আছে তাই।

তবুও আরো কথা থাকে।

আমার সবকিছু থাকা সত্ত্বেও আমি এক নীড়হারা পাখি।এই জন–অরণ্যে আমি একা। পথ হারিয়ে এই নিভৃত পল্লীর কোলে ঠাঁই খুঁজে পেয়েছি।

আপনি এত হাসি –খুশী, এত কাজ করেন, দেখে মনে হয় না আপনার কোন দুঃখ আছে।

দুঃখ আমার নেই। তবে অপমান বোধ আছে। একজনকে আশ্রয় – প্রশ্রয় দিয়ে আমি প্রতারিত হয়েছি।  

যদি আপনার আপত্তি না থাকে তবে আমাকে বলতে পারেন।

আপনাকে বলে আমার কি লাভ? আপনি কি আমার মনের ভার লাঘব করতে পারবেন? আপনার পরিচয় তো আমার জানা নেই। আগ্রহও জাগেনি। মনে হয় যারা একা থাকে তাদের একটা অতীত আছে। 

নাসিরুদ্দিন চুপ করে থাকে। নিজের মগ্ন চৈতন্যে কোথায় যেন বেদনার সুর বেজে উঠে। তারপর বলে, আপা, যদি অজান্তে আপনাকে কষ্ট দিয়ে থাকি তার জন্য ক্ষমা চাই। 

ক্ষমা চাওয়ার মত অপরাধ করেন নি। স্বাভাবিক জীবন যাদের, তাদের গল্প –সল্প আলাদা। তারা জীবনের সুখ –দুঃখের কথা আপনা থেকে অনর্গল বলে যায়। আপনার আমার মত দরজায় অর্গল এঁটে রাখে না। আমার জীবনে অনেক কথা নেই, অনেক ঘটনা নেই। তবে যা ঘটেছে তা মর্মান্তিক। আমি ছোটবেলা থেকে একজনকে চিনতাম। স্কুলের নীচের ক্লাস থেকে। তারপর বহুদিন গত হয়েছে। ইউনিভার্সিটিতে পড়বার সময়ে আবার তার সঙ্গে দেখা হয়। পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে মেলা –মেশা একটু বেশী হয়ে গেল। ভাবলাম প্রেমে পড়েছি। সেও তাই ভাবলো। আমার চাইতে তার আগ্রহই অধিক। আমি তা সত্য বলে মেনে নিলাম। পাশ করে বের হলাম উভয়েই। ভাল রেজাল্ট বলে তার ভাল চাকুরী হল। আমি পেলাম শিক্ষকতা। তার আর বিলম্ব সইছে না। সুতরাং পরিবারের দ্বারস্থ হতে হল। উভয় পরিবারের সম্মতি ক্রমে আমাদের সাজানো গোছানো ঘর –সংসার হলো। সুখে, আনন্দে, শান্তিতে দিন যেতে লাগলো। বছর দুয়েক কেটে গেল স্বপ্নের ঘোরে। এবার পরিবারের কলেবর বৃদ্ধির চিন্তায় আমরা বিভোর। সব কাজে তারই উৎসাহ অন্তহীন।

আমরা ক্লাবে, পার্টিতে যাই। খুব মজা করি। একবার পরীক্ষার খাতা নিয়ে খুব ব্যস্ত। বেশ কিছুদিন যে কোথা দিয়ে গেল! এই সময় তাকে বেশ উদাসীন মনে হতে লাগলো। প্রশ্ন করলে উড়িয়ে দেয়। অল্পদিনের মধ্যে তার আমার দূরত্ব বৃদ্ধি পায়। আমি নিজের দোষ খুঁজে বেড়াই। হঠাৎ একদিন বলে, আমার পোস্টিং হয়ে গেছে।     

বদলি হয়েছ, কোথায় ? 

চট্টগ্রামে।      

হঠাৎ বদলি কেন?

আমি আর এখানে থাকবো না। কালই চলে যাব।

মনে পড়লো সেদিন সে বাসায়ই ছিল। অফিসে যায়নি। আমি ছিলাম কলেজে। এরই মাঝে তার যা কিছু সব গুছিয়ে রেখেছে। আগে কোনদিন কাপড় –চোপড় , বাক্স গোছাতে জানতো না। এবার খুব ভালভাবে পেরেছে। অবাক হয়ে বললাম, এত তড়িঘড়ি পোস্টিং অর্ডার এলো কেন? কি করেছ অফিসে?

- কিছুই করিনি। আমি যেতে চেয়েছি, তাই যাচ্ছি।  

আরো বিস্মিত হয়ে বললাম, কেন? কি বলছো এসব? 

পরে তোমার সব কথার উত্তর দেবো, আজ নয়। বলে ঘুমিয়ে পড়লো। পরদিন সে চলে যাওয়ার পর আমি আমার টেবিলের উপর ডিভোর্স লেটার পেলাম। বিশ্বাস করতে পারিনি। ঘটনার আকস্মিকতায় জ্ঞান হারালাম।সেদিন ছিল ছুটির দিন। দুপুরে আমাদের বাড়ির লোকজনদের ডেকেছিলাম একসংগে লাঞ্চ করবো বলে। তারা এসে আমাকে অজ্ঞান অবস্থায় আবিষ্কার করে। শুশ্রূষা করে। জ্ঞান ফেরে আমার। বিকেলে অবস্থার উন্নতি হলে ইকবাল কোথায় তারা জানতে চায়। আমার মনে পড়ে গেল সব কথা। আমি তাদেরকে চিঠিটি দেখতে বললাম।তারাও বিস্ময়ে নির্বাক। কি করে বুঝাই যে কিছুই হয়নি, কোন ঘটনা ঘটেনি। আমার ভাইয়েরা ইকবালের অফিসে খোঁজ নিতে গেল। এক অবিশ্বাস্য সংবাদ সংগ্রহ করে আনলো।ইকবাল কারো বাগদত্তাকে নিয়ে পালিয়ে গেছে দেশের বাইরে। চট্টগ্রামে নয়। চাকরীতে সে বেশ কিছুদিন আগেই ইস্তফা দিয়েছে। আমি আবার মূর্ছিত হয়ে পড়লাম। 

একটানা এত কথা বলে মালিহা থামলো। নাসিরুদ্দিন ও এরকম একটি গল্পের আকস্মিকতায় নির্বাক। মনে মনে খুবই বিব্রত বোধ করল। ভাবলো, এরকম প্রশ্ন করা মোটেই উচিত হয়নি। কেউ আর কোন কথা না বলে উঠে যার যার গন্তব্যে চলে গেল। কেন যেন অনেকদিন পর মালিহার চোখে অশ্রু এলো। বঞ্চনার যন্ত্রণায় অধীর হলো। মেয়েদের হোস্টেলে এসে হাতমুখ ধূয়ে শয্যায় আশ্রয় নিল। ছাত্রী রুমমেটরা আপার বিষন্নতায় বিস্মিত। তারা চা-নাস্তা তৈরী করে নিয়ে এলো। জানতে চাইলো আপার শরীর খারাপ কিনা। জবাবে বললেন, তেমন কিছু নয়। বাড়ির কথা মনে পড়ছে। একমেয়ে সাহস দিয়ে বললো, সামনে তো রমজানের ছুটি আছে, তখন বাড়ি যাবেন। চা পান করলো মালিহা। মেয়েদের খোঁজ –খবর নিল। 

মেয়েদের সর্বপ্রকার তত্ত্বাবধান মালিহা করে থাকেন। কারণ প্রিন্সিপাল, ভাইস –প্রিন্সিপাল ক্ষণস্থায়ী। বদলী হয়ে এ কলেজে আসার পর পরই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দরজায় ধর্না দিতে থাকেন অন্যত্র চলে যাবার জন্য। মালিহার মনে হয় এ কাজটি খুবই খারাপ। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। এ দিকটিতে কারো মনোযোগ নেই। যে কিছুদিন থাকেন, কলেজে না পড়িয়ে প্রাইভেট টিউশানী করে চলে যান। 

সপ্তাহখানেক পর। নাসিরুদ্দিন আর মালিহা কলেজ শেষে গল্প করছিলেন। নাসিরুদ্দিন বললেন, আপা, সেদিন আপনার সঙ্গে কথা বলে সারারাত ঘুমাতে পারিনি। কেবলই মনে পড়ছিল, কোথায় যেন আপনার ঘটনার সঙ্গে আমার জীবনের ঘটনার মিল রয়েছে। আপনার অনুমতি পেলে বলতে পারি। মালিহা বলেন, অনুমতি দিলাম।   

নাসিরুদ্দিন বলতে লাগলেন, আমার জীবনের ঘটনাও খুব মর্মান্তিক। আমি যখন অনার্স পড়ি তখন ট্রেনে একদিন ইডেন কলেজের একটি ছাত্রীও ভ্রমণ করছিল। আলাপ হলো। জানতে পারলাম আমরা একই গন্তব্যের যাত্রী। স্টেশনে নামবার পর মেয়েটির গার্জিয়ান বললো, আপনি যখন আমার এলাকার ছেলে, এরপর নুসরাত আপনার সংগেই আসা যাওয়া করবে। নুসরাত আমার অনেক জুনিয়র। কয়েক বছর ধরে তাকে নিয়ে যাতায়াত করতে হলো নিজের বড় ভাইয়ের মত। সে দেখতে শুনতে ভাল, হাসিখুশী। ঝর্ণার মত চঞ্চল, উদ্দাম, উচ্ছ্বল। আমি চুপচাপ বলে প্রায়ই সে অভিযোগ করে। ঢাকায় আমি তার লোকাল গার্জিয়ান। আমার পড়াশুনা শেষ। সে তখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়। তাকে নিউমার্কেট নিয়ে যাওয়ার বায়না ধরে। আমার অস্বস্তি বোধ হয়। শেষ পর্যন্ত আমাদের মেলামেশা শুরু হয়। সে বলে, আমার পড়াশুনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনি কোথাও যাবেন না। বললাম, চাকুরী করতে হবে না?

- চাকুরী করবেন, বিয়ে করবেন  না? 

- চাকুরী না থাকলে বিয়ে করবে কে?  

- আগে চেষ্টা করে দেখেন, তারপর বলবেন।

- বৃথা চেষ্টায় কাজ নেই। মেয়ে খোঁজার চাইতে চাকুরী খোঁজার প্রয়োজন অধিক। পাত্রী তো পথে ঘাটে পড়ে থাকে না।

- পড়ে থাকে। দেখতে পান না আপনি? দেখার চোখ থাকতে হয়।

- একদিন ও না দেখিলাম তারে। কোথায় আছে সে?

- আমার চোখের দিকে তাকান। সেখানে যার ছায়া ভেসে উঠবে সেই হবে আপনার পাত্রী। আপনি তাকে খুব চেনেন।

- কই দেখছিনা তো? চোখের মণি দেখা যাচ্ছে।

- কেন আমাকে দেখছেন না? আমি কি অদৃশ্য, অশরীরি?

- তুমি? 

- হ্যা আমি। এবং আমিই, আর কেউ নয়, কোন ভাবেই নয়, কোনদিন নয়, কোন কালেই নয়। চিরকালের আমি! কোনদিন যদি আমাকে ছেড়ে গেছ!

সে আমাকে জড়িয়ে ধরে রইলো। তার বক্ষের হৃদস্পন্দন আমার বক্ষে সঞ্চারিত হলো। আমি সুপ্তিমগ্ন থেকে জেগে উঠলাম। দেখলাম নুসরাতের চোখে পানি।

- কাঁদছো কেন?

- কাঁদবো না, আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। আমি মরে যাব, আমার পড়াশুনা হবে না, জীবন নষ্ট হবে। আমি কি ভাল মেয়ে নই? খারাপ কোনদিক?

- নিশ্চয়ই ভাল মেয়ে। কোনদিন কিছু বলেছি?

- তবে কেন আমার সঙ্গে ভাইগিরি কর?

চিন্তায় পড়ে গেলাম। লোকে কি ভাববে? ওর গার্জিয়ান হয়ে ওকে দখল করে নিয়েছি! কিন্তু বেশী চিন্তা করবার সুযোগ পেলাম না। সে আমাক এত কথা বলতে লাগলো, এত আব্দার করতে লাগলো, যে আমার সকল বাধা চূর্ণ –বিচূর্ণ  হয়ে বন্যার স্রোতে ভেসে গেল। সে নিজে উদ্যোগী হয়ে বিয়ে ঠিক করে ফেললো। দুই পরিবারের সম্পর্ক দেখলাম বেশ জমে উঠেছে। ইতিমধ্যে তারও ইউনিভার্সিটির চৌকাঠ অতিক্রম করা হয়ে গেছে। আমি একটি কলেজে চাকুরী করি। বাসা ভাড়া করে থাকি। সে আমার বাসায় আসে প্রতিদিন বিকেলে। গোছগাছ করে। চা তৈরী করে নিজে খায়, আমাকে দেয়। সে তখনও হোস্টেলে থাকে। চাকুরীর খোঁজে অফিসে এবং অন্যান্য স্থানে ধর্না দেয়। এভাবে সম্ভবতঃ তখনই কারো সাথে তার পরিচয় ঘটে। সে কথা বলে প্রচুর। সাহসী মেয়ে। ছিনিয়ে নিতেও জানে, মারিয়ে যেতেও পারে। আমি তা পারিনা। শেষের দিকে তার কি যেন ব্যস্ততা থাকতো। আমার কাছে তেমন আসতো না। বলতো একটু বিরহ সহ্য কর। না চাইতে জল পেলে তেষ্টা মিটে যায়। 

তার সাজগোজের সখ। দুই পক্ষের কেনাকাটা হয়েছে প্রচুর। বিয়ের অনুষ্ঠান ঢাকায় হোক, তাই তার পছন্দ। সুতরাং সেভাবেই বন্দোবস্ত করা হয়। বিয়ের দিন বিবাহ –বাসরে অতিথিরা সবাই হাজির। কনের দেখা নেই। তিনি গিয়েছেন বিউটি পার্লারে। অভ্যাগতদের আর কত বসিয়ে রাখা যায়। খাবার পরিবেশন করা হয়। খাওয়া শেষে সবাই প্রায় নববধূকে না দেখেই চলে যায়। সময়টা ছিল দুপুরে। দুই পরিবারের লোকেরা কনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এমন সময়ে হন্তদত হয়ে তিন মেয়ে ছুটে এলো। তারা নুসরাতের সংগেই ছিল। তারা যে সংবাদ পরিবেশন করলো, তা অবিশ্বাস্য, মর্মান্তিক। তাদের বক্তব্য হচ্ছে নুসরাত সাজগোজ করতে অনেক সময় নেয়। তারপর ঘড়ি দেখে নেমে আসে নীচে। একটি বেবি ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে ছিল। সে তার ভিতর ঢুকে পড়ে তার স্যুটকেস সহ। সঙ্গীদের বলে তোমরা অন্য বেবি ট্যাক্সি ভাড়া করে আস। তিন মেয়ে হতভম্ব। একটু দূরে গিয়ে ট্যাক্সি থামে। কাকে যেন ত্বরিত তুলে নেয়। তিন মেয়ের কাঁপুনি শুরু হয়। তারাও দ্রুত এসে বিবাহ আসরে উপস্থিত হয়। প্রথমে দেখে নুসরাত পৌঁছেছে কি না। তারপর বরকে প্রশ্ন করলো সে কিছু জানে কিনা। কোথায় যেতে পারে, কোথায় গেল। সঙ্গে অনেক গহনা, টাকাপয়সা আর কাপড় চোপড়। কিড্‌ন্যাপড্‌ হয়েছে কিনা। তিন মেয়ের কান্না আর সকলের বিমর্ষ ভাবে ক্যমিউনিটি সেন্টারে এক বেদনা বিধুর পরিবেশের সৃষ্টি হলো। সব বিল শোধ করে ওরা সবাই বাসায় ফিরে এলো। এমন সময় একটা ফোন এলো। এক অপরিচিত লোকের কন্ঠ। আমি নুসরাতকে নিয়ে ইংল্যান্ডে চলে যাচ্ছি। নুসরাতের বাবা নুসরাতের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। নুসরাত বললো, আপনারা আমাকে চেনেন। আমি স্বেচ্ছায় ইকবালের সঙ্গে সহযাত্রী হয়েছি। ঐ মুখচোরা নাসিরুদ্দিনের সাথে নিরানন্দ জীবন কাটানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এ লোক আমারই মত, আমার উপযুক্ত। আমার পথ আমি খুঁজে পেয়েছি। আমার সিদ্ধান্তে আমি অটল। আর কয়েক মিনিটের মধ্যে আমাদের ফ্লাইট। 

শুনে সকলের প্রাণবায়ু বহির্গত হওয়ার উপক্রম। কান্নার রোল পড়ে গেল। বিশেষ করে কনের মা ও বোনেরা বিপর্যস্ত হয়ে পড়লো। নাসিরুদ্দিন বরের পোশাক খুলে ফেললো। নুসরাতের বাবা মাকে সান্ত্বনা দিল। বললো, আপনারা আজকের ঘটনার জন্য দায়ী নন। তারা বললো, নুসরাত বাটপারের পাল্লায় পড়েছে। তোমার মত ছেলে সে কোথায় পাবে। নাসিরুদ্দিনের আত্মীয়েরা সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে গ্রামে ফিরে গেল। বলে গেল তোমার কোন চিন্তা নাই। কবুল তো ভাগ্যিস পড়া হয়নি। যে যাই বলুক, নাসিরুদ্দিন জানে গত পাঁচ বছরে তাদের কত কথা, কত স্বপ্ন, কত স্মৃতি। কেউ জানে না ভুলে যাওয়া এত সহজ নয়। ‘ভুলে যাওয়ার কঠিন সংকল্পই মনে রাখার প্রবল সহায়ক।’ নাসিরুদ্দিনের মনে পড়লো, অতীতের ঘটনা আমি ঘটাই নি। স্মৃতির আগুনে দগ্ধ হতে হবে চিরকাল। চিরকুমার থাকবো। বৌ খুঁজতে আর যাব না কোনদিন। ‘দৃষ্টিপাত’ –এর আধারকারের কথাগুলো তার জীবনে সত্য হলো, ‘প্রেম জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য, মৃত্যুকে মহিমা।  কিন্তু প্রবঞ্চিতকে দেয় কি? তাকে দেয় দাহ। যে আগুন আলো দেয় না, অথচ দহন করে।’ এই পাড়াগাঁয়ে বেশ আছি। ঐ বাঁশ বনের ধারে লেকচারারদের জন্য দুটি কুড়ে ঘর বাঁধা আছে। একটি উঠান, একটি ইঁদারা, একটি রন্ধনশালা। রাতে যখন ঐ বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ ওঠে তখন মনে হয়, স্বর্গের বাগানে বিরাজ করছি। বসে বসে তার রূপসুধা পান করি। স্বপ্নের ঘোরে চলে যাই। অন্য প্রফেসাররা থাকলে তাদের সঙ্গে আনন্দলোকের গল্প করে সময় কাটাই।

নাসিরুদ্দিন থামলেন। শ্রোতা মালিহা নির্বাক। এই তো সেই ব্যক্তি যে তাকে প্রতারনা করেছে। তার ক্ষেত্রে ইকবাল প্রচন্ড উৎসাহী, উদ্দাম। মালিহা শান্ত, স্নিগ্ধ, বিশ্বাসী। ভাগ্য যাকে মারে তাকে রক্ষা করে কে?

মালিহা, নাসিরুদ্দিন দুজনেই শান্ত, সৎ, কর্তব্যপরায়ণ।কাজ করতে ভালবাসেন। সারা বছর কলেজের কাজে ব্যস্ত থাকেন। দুজনের জীবনের প্রতারণা আর বঞ্চনার গল্প শুনে তাদের পরস্পরের জন্য কেমন একটা সহানুভূতির মমতা জাগে। নাসিরুদ্দিন একদিন বলেন, মালিহা আপা, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেন না? মালিহা নীরব থাকেন। তারপর বলেন, ভবিষ্যৎ চিন্তা করে কি লাভ? এইসব ইতিহাস নিয়ে নতুন করে পাত্র খোঁজা, ভাল মন্দের পরীক্ষা দেয়া এসবে আর রুচি নেই। আআর মন আমারই থাক।কারো কাছে বন্দক রাখার দরকার কি? নির্ঝঞ্ঝাট জীবন, শান্ত নদীটির মত –যেমন আপনার।

- উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমারও নেই, আপনারও নেই। তবুও পাশাপাশি বন্ধুর মত থাকলে মন্দ কি? না হয় বন্ধুর মত দুঃখ সুখ ভাগ করে নিলাম। জীবন কাটিয়ে দিলাম নদীর আপন স্রোতের মত। 

- তাকে কি জীবন বলে? এক সঙ্গে থাকলে অনেক স্বার্থ, অনেক আশা, অনেক পাওয়া –না পাওয়ার প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়। তখন আনন্দ বেদনার জীবন তরী বাইতে গিয়ে বৈঠা হয়ে দাঁড়ায় অস্ত্র –একে অপরকে ঘায়েল করতে দ্বিধা করে না। আপনার আমার অতীতে কোন টানা পোড়েন ছিলনা। বিনা মেঘে নীলাকাশের কোল থেকে বজ্র পড়ে সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে গেল। ওরা তো সুখেই আছে – আমার ইকবাল, আপনার নুসরাত। আপনি আমি নির্বাসিত জীবন যাপন করছি। আগেকার দিন হলে আন্দামান অথবা নিকোবরে গিয়ে আশ্রয় নিতে হতো!

- আমার তো বলার কিছু নেই। আপনি চিন্তা করে দেখেন। আমাদের তো এখানে অনেকদিন থাকা হলো। আমরা অন্য কোথাও বদলী হতে পারি। এ জীবন থেকে অন্য জীবনে পলায়ন।‘হেথা নয়, অন্য কোথাও অন্য কোনখানে।’

মালিহা গভীর ভাবনার মধ্যে পড়ে গেল। ইকবাল কত ভাল ছেলে ছিল। সেই তাকে ত্যাগ করলো। আর একে তো চেনেই না। কেমন ভবিষ্যৎ? আবার যদি দুঃখ আসে, রাখবে কোথায়? তবে লোকটিকে তার পছন্দ। একসঙ্গে জীবন যাপন করতে গেলে যে জিনিসের প্রয়োজন হয়, তার নাম সহমর্মিতা, বিশ্বাস আর ধৈর্য। নাসিরুদ্দিনের তা আছে। নাসিরুদ্দিনের চিন্তা, ভাবনা কম নয়। সে মালিহাকে সুখে রাখতে পারবে কিনা। মালিহা শান্ত মেয়ে। বঞ্চনার বেদনায় তার অন্তর  নীল হয়ে আছে। সে যন্ত্রণা সে লাঘব করতে পারবে কিনা। বেশ কিছুদিন এভাবে গত হলো। একদিন মালিহা বললো, ঠিক আছে, চলেন সামনের গ্রীষ্মের ছুটিতে আমাদের বাড়িতে যাই। তার আগে পোস্টিং চেয়ে দরখাস্ত দিয়ে যাই। এখানে প্রিন্সিপাল, ভাইস –প্রিন্সিপাল, আরেকজন প্রফেসর বদলী হয়ে আসছেন। আমাদের এখন আগের মত দায়িত্ব নেই। 

সে ভাবেই পরিকল্পনা করা হল। ছুটিতে বাড়িতে গিয়ে আড়ম্বর না করে উদ্বাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। দুই পরিবারের পরিচয় হলো। দুটি প্রাণের গভীর অন্ধকার জীবনে যেন একটি আলোর মশাল জ্বলে উঠলো। ছুটি শেষে তারা কলেজে ফিরে এলেন। থাকলেন আগের মতই। যেহেতু তারা এখানে বহুদিন ধরে চাকুরী করছিলেন, সুতরাং তাদের পোস্টিং আসতে বিলম্ব হল না। একই শহরে। একজন মেয়েদের কলেজে, অন্যজন ছেলেদের কলেজে। যথাসময়ে তাদের বিদায় সম্বর্ধনা এবং নতুন কলেজে যোগদান। এখানে একটি বাসা ভাড়া করে তাদের সংসার জীবন শুরু। অনেকদিন পর মালিহার কেমন জানি অস্বস্তি বোধ হতে থাকে।তবুও তাদের যাত্রা শুরু হয় ভালভাবেই। কলেজের কাজও ভাল চলছে। এর কিছুকাল পরেই তাদের সংসারে নতুন মুখের আগমন ঘটে। একটি পুত্র সন্তান তাদের কোলে আসে। মুখখানা তার অবিকল মায়ের মত। দেখতে দেখতে সে বড় হয়ে উঠে। স্কুল, কলেজ অতিক্রম করে সে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। ইতিমধ্যে মালিহা, নাসিরুদ্দিন নানা স্থানে বদলী হয়েছে।এবার সিনিয়র হিসাবে ঢাকায় বদলী হয়ে আসে। ছেলে আশীস অর্থপেডিক সার্জারিতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান করছে। ছোট টি মেয়ে। সে পড়ে বাবার মত অংক। 

ছেলে প্রতিদিন তার রোগীদের কষ্টের কথা বলে, তাদের মানবিক আচরণের কথা বলে।একদিন বললো, একজন পেশেন্ট এসেছে মাল্টিপল্ ফ্র্যাকচার নিয়ে। থাকেন বিদেশে। ত্রিশ বছর পর দেশে এসেছেন বেড়াতে।একদিন সড়ক দুর্ঘটনায় শিকার হন হাইওয়েতে। সঙ্গে থাকা স্ত্রী নিহত হন। ইনি প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। হাসপাতালে আছেন কয়েক মাস ধরে। খুব কষ্ট তার। আশীসকে তার খুব পছন্দ।তিনি আশীসের জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। আশীস তাকে একবার দেখে গেলে তার কষ্ট অনেক উপশম হয়। প্রায়দিনই সে এই অদ্ভুত চঞ্চল রোগীর গল্প বাসায় বলে।রোগী চায় কোন দৈব বলে উঠে দাঁড়াতে। তবে তার অবস্থার এখন  উন্নতি হয়েছে। হাঁটতে শিখেছে ক্র্যাচে ভর করে।বাড়ি গিয়ে দেখবে তার শূন্য ঘর। কান্নায় তার চোখ ছল ছল করে ওঠে। তার একমাত্র পুত্র সাত সাগর পারের নীল নয়নার হাত ধরে আলাদা জীবন যাপন করে। সেই শ্বেতাঙ্গিনী দক্ষিণ এশিয়া লোকদেরকে দু’চক্ষে দেখতে পারেনা।ছেলের সাথে ফোনেই বাতচিত হয়। চেহারা দেখবার সৌভাগ্য আর হয় না। তাদের ইচ্ছা ছিল দেশ থেকে বেড়িয়ে গিয়ে নিজের বাড়িতেই দুজনে জীবন কাটাবে। মাঝে মাঝে এদেশ ওদেশ ঘুরতে যাবে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। There is a slip between the cup and the lip. কিন্তু এখন কি হবে? বিলেতে একাকী জীবন যাপন বড় দুঃসহ। দেশে যারা আছে তারা আন্য জেনারেশান। আদর যত্ন করে তারা। তবে ভার নেবার মত কেউ নেই।

সেদিন ভদ্রলোকের প্লাস্টার খোলার দিন। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোগী ভদ্রলোক বলেন, আমি গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। একমাত্র তোমার মুখখানা আমার অনন্দের উৎস। মনে হয় তুমি আমার জন্ম জন্মান্তরের চেনা। স্ত্রী নেই, স্বজন নেই। এই বিশ্বসংসারে কোথায় গিয়ে পড়বো! কি পাপ করেছিলাম। আমার কেন এমন হলো? তোমার মুখখানা স্মরণ করে যেন আমার দিনগুল শেষ হয়। তোমার জন্য আমার অশেষ দোয়া থাকবে।

আশীসের মা এই পথে বাড়ি ফিরছিলেন। ছেলের দেরী দেখে ফোন করলেন। জানতে পারলেন আশীস এখনই বাড়ি ফিরবে। মা বললে, চল তোমাকে নিয়ে যাই, তোমার রোগীটিকেও একবার দেখে যাই। মালিহা হাসপাতালে প্রবেশ করলেন। পায়ে পায়ে গিয়ে হাজির হলেন সেই রোগীর কেবিনে। দরজায় নক্‌ করায় আশীস এসে দরজা খুলে দিল। বললো, মা  এই আমার পেশেন্ট। একবার দেখে যাও। ইনার নাম মিস্টার ইকবাল। বড় কষ্ট পেলেন তিনি।

মালিহা একদৃষ্টিতে পেশেন্টের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অস্ফুটে উচ্চারণ করলেন –ইকবাল! এতকাল পরে চেহারা চিনতে একটুও দেরী হয়নি। অন্তরের অন্তঃস্থলে ইকবালের চেহারা একটুও ম্লান হয়নি। যদিও বয়সের চিহ্ন ধারণ করেছে। ইকবালেরও তাই। তারও ইচ্ছা করছিল সেই বহুকাল পূর্বের মত মালিহা বলে চিৎকার করে ওঠতে। 

আশীস ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত। কেউ কোন কথা বললেন না! কোন সাধারণ কুশল বিনিময় পর্যন্ত নয়। দুজনেরই কন্ঠ রুদ্ধ। তাদের মধ্যে কোন অমিল বা বিরোধ ছিলনা। তবুও ভাগ্য তাদের টেনে দুদিকে দুজনকে ছিনিয়ে নিল। এর কি নাম কে জানে? হয়তো বা নিয়তি! তারপর সম্ভাষণ বিনিময় ব্যতিরেকেই মালিহা কক্ষ হতে নিষ্ক্রান্ত হলেন। ইকবাল আশীসকে ডেকে বললো, তোমার মা কে আমার সালাম দিও। মায়ের সঙ্গে তোমার চেহারার বড্ড মিল। এবার তুমি আস। অনেক রাত হলো। তোমার মা অপেক্ষা করছেন। আশীস বেরিয়ে গেল। ইকবালের চোখে অশ্রুর বান এলো। মনে পড়তে লাগলো অতীতের সেই সোনাঝরা দিনগুলো। তবুও এতবড় অন্যায় কাজটি করেছিল একটি উদ্ভ্রান্ত উচ্ছৃঙ্খল মেয়ের জন্য। কি জানি কি ছিল বিধাতার মনে! তারই পাপের ফল তাকে বাকী জীবন ভোগ করতে হবে। 

মালিহা বাসায় ফেরে। বাধ ভাঙ্গা কান্নার স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অচিন গাঙ্গের স্রোতে। অশীস কম্পিউটার নিয়ে বসে তার কাজে। নাসিরুদ্দিন লক্ষ্য করে মালিহার বিষন্নতা। জানতে চায় কোথায় কোন বিভ্রাট ঘটেছে কিনা। মালিহা ব্যালকনিতে গিয়ে বসে। নাসিরুদ্দিন তার পাশে। মালিহা ব্যক্ত করে তার অগ্নিদগ্ধ হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কথা। কেমন করে দুজন প্রতারক দুটি ভাল মানুষকে প্রবঞ্চিত করে অনায়াসে আরেকটি নৌকায় উঠে চলে গেল। পিছনে পড়ে রইলো দুজন আধারকার, যারা সেই ‘দিপ্তীহীন অগ্নির নির্দয় দহনে পলে পলে দগ্ধ হলেন।’

বিধাতা বড় নাট্যকার। মালিহা নাসিরুদ্দিনের মিলন, আর আজকের এই নাটকীয় সাক্ষাৎ একেবারেই অপ্রত্যাশিত। নাসিরুদ্দিনের বক্ষ পিঞ্জরে সেই একই ঝড়। তার নুসরাত এখন পরলোকে চলে গেছে। বলার মত আর কিছুই ছিল না। দুজনে উদাস দৃষ্টি মেলে সুনসান শূন্য গলির দিকে তাকিয়ে রইল। 

১৬.১২.২০০৯        


Saturday, June 6, 2026

গল্প - এক টুকরো হাসি

 কি বলছো? আমি ডাক্তার? হ্যা, আমি ডাক্তার। ডাক্তারই তো! আমি তো লোকের কাছে চিকিৎসক হিসেবেই পরিচিত। মৃত্যু যখন অন্ধের মত আবাল –বৃদ্ধ –বনিতা, সকলকেই ভূ-স্বর্গের কানন থেকে নিষ্ঠুর রসিকের মত ছিনিয়ে নিতে আসে, তখনই ডাক্তার তার প্রতিরোধ করবার প্রয়াস পায়। মনে হয় বিধাতা যমদূতকে দু’টি চোখ দান করলেই ভাল করতেন। 

এমন এক বসন্ত কাল। সে আজ থেকে কুড়ি বৎসর আগের কথা। বয়স ছিল তরুণ, মন ছিল নবীন, দৃষ্টি ছিল রঙ্গিন, জগৎ ছিল মধুময় আর জীবন ছিল কল –কাকলীতে  মুখরিত। গাছে গাছে পাতা ছিল, বৃন্তে বৃন্তে মুকুল ছিল, ফুলে ফুলে গন্ধ ছিল, ফলে ফলে মধু ছিল আর চিত্তে ছিল প্রচুর রস। তখন আকাশ ছিল রঙিন, সূর্য ছিল মিতা, উদয়ে জানাতো আভিনন্দন আর অস্তে জানাতো শুভাশীষ, আগামী ভোরের তরে। বাতাস বয়ে আনত কোন অজানা রাজ্যের সবুজ কন্যার মায়াবাণী, প্রাণে জাগাতো মৃদু শিহরণ, মনে লাগাতো হালকা খুশীর ছোঁয়া, দেহে জাগাতো খুশীর ঢেউ আর আলতো ভাবে চিবুকটি নেড়ে চলে যেত। আকৃষ্ট হতাম ভোরের পাখির কলতানে। জেগেও উঠতাম। তবে মায়াবিনী নিদ্রার হাত থেকে বিশেষ মুক্তি পেতাম না। অনেকটা তন্দ্রাছন্ন হয়ে কাটাতাম আর অনুভব করতে চেষ্টা করতাম, ভোরের পাখি কি বাণী প্রচার করে সদ্য নিদ্রোত্থিত জগতের কাছে। ভাবতাম তারা আমারই জন্য মেতে উঠেছে। তারাই আমার মনের মিতা, তারাই অন্তহীন সুখের সাথী। তারা আমার জীবনে চাঞ্চল্য জাগায়, কাজে উৎসাহ দেয়, কাব্যে প্রেরণা জোগায়। আমার পৃথিবীকে রংধনুর সপ্তরঙে সজ্জিত করে আমার সম্মুখে ধরে রাখে। 

এমন সময়ে এমনি পরিবেশে আমি চিকিৎসা বিদ্যায় সনদ লাভ করেছিলাম। ‘ডাক্তার’ এই একটি মাত্র শব্দের উপর নির্ভর করে আমার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ছবি অতি সুন্দর সুষ্ঠুভাবে কল্পনা করতাম। সেদিন দেখেছিলাম খ্যাতি, যশ, টাকা আর স্ত্রী –পুত্র –কন্যাসহ সুখী পরিবার। যেখানে দুঃখ দৈন্য প্রবেশ করবার ভিসা কোনদিন পাবে না। 

কিন্তু আজ? 

আজ আমি নামকরা ডাঃ মাহবুব চৌধুরী। বাড়ি, গাড়ি, টাকা, কড়ি কোন কিছুরই অভাব নেই। কিন্তু এসব যেন তুচ্ছাতিতুচ্ছ মনে হচ্ছে। সব থেকেও আজ আমার কিছুই নেই। আমি সুখী বটে, আমার শান্তি নেই। জীবনে যা চেয়েছি, তাই পেয়েছি। এর বেশী যে মানুষের কিছু চাওয়ার আছে, তা আমার রঙিন মনের অগোচরে ছিল। তাই হয়তো বিধাতার কাছে শান্তির জন্য কোন প্রার্থনা করিনি।

জীবনে তেতাল্লিশটা বসন্ত আমি পাড়ি দিয়ে এসেছি। দিনগুলো কেমন করে কেটে গেল তা আর নাই বা বললাম। তবে গত বসন্তের একটি দিনে জগতের সমস্ত আলো নিভে গিয়েছিল। কেবল অন্ধকারের অতল তলে তলিয়ে গিয়েছি, কোন অবলম্বন আজও পাইনি। জীবনে কখনও পাব বলে আশাও করিনে। কারণ আশার আরেক নাম মরীচিকা। কোথা দিয়ে কি হয়ে গেল বুঝতে পারিনি। 

এমনি এক সকালে অসময়ে হাসপাতালে যেতে হল। কিছুটা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কৌতুহল নিয়েই গিয়েছিলাম। যেয়ে দেখি একটি তরুণ নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। হয়তো তার যন্ত্রণা প্রকাশ করবার ক্ষমতা আর নাই। সুন্দর, বলিষ্ঠ, স্বাস্থ্যবান যুবা। গ্রীষ্মের প্রখর তাপে বৃক্ষলতা যেমন খানিকটা নিরস হয়ে নেতিয়ে পড়ে, একেও অসহ্য যন্ত্রণায় কাবু করে ফেলেছে। রোগটা বিপদজনক –অ্যাপিন্ডিসাইটিস। হাতে সময় ছিলনা। কাজেই তাড়াতাড়ি করতে হলো। নির্দিষ্ট সময়ে সব যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করে সকলের অনুমতি নিয়েই অস্ত্রোপ্রচারে মন দিলাম। বিষয়টা খুবই গুরুতর। আরো আগে আসলে হয়তো রোগটি এত জটিল আকার ধারণ করতে পারতো না। অতি সাবধানে হাত চালাচ্ছিলাম। ওকে বাঁচাবার দায়িত্ব যে আমিই নিয়েছিলাম। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, বিধাতা করেন আরেক। এত সতর্কতা সত্ত্বেও কখন হাত পিছলে হৃদপিন্ডের পরমাত্মীয় একটি ধমণী কেটে গেল। আমি নার্ভাস হয়ে পড়লাম। কোন রকমে রক্ত বন্ধ করা গেল। আসল চিতিৎসা ঠিকই হলো। আমার অভ্যস্ত হাতে কোন প্রকার ত্রুটি হলো না। যথাসময়ে অপারেশন শেষ হলো। রোগী পৃথিবীর আলো বাতাসের স্পর্শ পেল। সবাই বেশ আশ্বস্ত হলো। কিন্তু আমার চিত্তে কোন স্বস্তি ছিল না। আমি প্রতি মুহূর্তে একটা কিছুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। 

পরের দিকে রোগীটিকে তার বেডে ফিরিয়ে আনা হলো। খাণিকক্ষণ বাদে একটি তরুণী রোগীর দর্শন প্রার্থী হয়। মেয়েটি অপরূপ লাবণ্যময়ী। শান্ত মুখশ্রী। উজ্জ্বল দীপ্তি তার চোখে। এগিয়ে যেতে লাগলো ১৩ নম্বর বেডের দিকে। এদিকে ছেলেটির হঠাৎ ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু হয়েছে। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। তার পরিণতিও বুঝে গিয়েছিলাম। শেষ মুহূর্ত উপস্থিত। এই সময়ে মেয়েটি চাপা উৎকন্ঠা নিয়ে মৃদু  অথচ দ্রুত পদক্ষেপে প্রবেশ করলো। রোগীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। ছেলেটি শেষবারের মত একটু হাসলো। কোনরকমে উচ্চারণ করলো, 

- ‘তুমি এসেছ, রুমু?’ 

রুমু জবাব দিল, ছোট্ট এক টুকরো হাসি দিয়ে। টলে গেল তার গাম্ভীর্য, ছিঁড়ে গেল তার আবরণ, ভুলে গেল বাস্তব দুনিয়া, ঢলে পড়লো মৃতপথ যাত্রীর উপর। আমি আর পরের খবর রাখিনি। তবে অভিভূত হয়েছিলাম, স্তম্ভিত হয়েছিলাম মেয়েটির হাসির কথা স্মরণ করে। হাসির ভেতর দিয়ে যে মানুষের হৃদয়ের গভীর বেদনাকে এত করুণ, এত হৃদয় বিদারক ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়, তা আমি কোনদিন দেখিনি, চিন্তাও করিনি। কেবল এক টুকরো হাসি –আর কিছুই নয়! শুনেছি মেয়েটি ও এই ছেলেটি একই পত্রিকায় কাজ করতো। তাদের লেখা প্রায়ই একই দিনে বের হতো। সেই সূত্র ধরে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। মেয়েটি শহরের হস্টেলে থাকে। তাকে এই ছেলেটিই দেখাশুনা করতো।     

গত এক বছর ধরে প্রতিটি মুহূর্তে সেই মেয়েটির এক টুকরো হাসি আমার  স্মৃতিতে আসা যাওয়া করছে। যে হাসি কেবল সর্বহারাদের মুখে ফুটে ওঠে। আর কেউ সে হাসি হাসতে জানে না। কেবলই মনে হয়, সে এসেছিলো আমার কাছে বাঁচতে –এসেছিল মৃত্যুর হিমশীতল পরশ এড়িয়ে এই মাটির পৃথিবীতে আবার শ্বাস প্রশ্বাস নিতে। কিন্তু অদৃষ্টের কি পরিহাস!  আমার জন্য তা হলো না। নব পল্লবিত, মুকুলিত শাখাটি ঝড়ের দাপটে নুইয়ে পড়েছিল আমারই কোলে। নিষ্ঠুর আমি, তাই তাকে আশ্রয় দিতে পারিনি। তাকে আমি নিজ হাতে উড়িয়ে দিয়েছি। 

আশা উদ্দামে পূর্ণ একটি টগবগে যুবকের আমি হন্তা। নীড়হারা পাখির নীড় আমি ভেঙেছি। চকোরীর চকোর, বন্ধুর বন্ধু, মিতার মিতা, প্রিয়ার প্রিয়া, দুর্বলের অবলম্বন আমি নিজ হাতে নষ্ট করে দিয়েছি। 

মানুষ কী ভরসা করে আসে আমার কাছে? বাঁচবে বলে। না, বাঁচানো আমার কাজ নয়। আমি ডাক্তার নই। কে বলে আমি ডাক্তার? 

আমি নরঘাতক! 

আমি যমদূত। 

পাপী, তাপী, খুনী! 

ও নামে কলঙ্ক দিও না। ও নাম কলঙ্কিত করো না। 

আমি খুনী, ছেড়ে দাও, যেতে দাও আমাকে। শাস্তি দাও! আমি খুন করেছি। কোল্ড ব্লাডেড মার্ডার! কেবল একজন মানুষকেই নয়, আরেকজনের আশা, আকাঙ্ক্ষা এবং ভবিষ্যত জীবনকে!

২৫.০৩.১৯৬১

কুমুদিনী কলেজ, টাঙ্গাইল         

...


উৎসর্গ -সপ্তর্ষি

  উৎসর্গ   আমার পিতাকে যাঁর জীবনের পাথেয় ছিল আপোষহীন নীতি আর শৃঙ্খলা ।   আমার মাতাকে ছেলেমেয়েদের মেধা ও মননশীলতায় যিনি ছিলেন নিব...