Saturday, May 30, 2026

গল্প - ছিন্ন বীণা

মাস্টার অব সোশাল সাইন্সে ভর্তির মৌখিক পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছিল নাহিদ। পরীক্ষা শেষ। রেজাল্ট জানার জন্য সকলেই উদগ্রীব। বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দায় খুব ভীড়। নানা জায়গা থেকে ছেলেমেয়েদের আগমন। অধীর আগ্রহে প্রহর গুনতে গুনতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। এমন সময়ে রেজাল্টের শিট নোটিসবোর্ডে ঝুলিয়ে দিল। সকলেই হুমড়ি খেয়ে পড়লো সফলতার আশায়। লাইট না থাকায় পড়তে কষ্ট হচ্ছিল। অনেকই নিজের নাম দেখে বাইরে বের হওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। মেয়েদের তো দেখবার উপায় নেই। এত ভীড়ে ঢোকা সম্ভব নয়। সেজন্য নাহিদ একজন ছাত্রকে উদ্দেশ্য করে বললো এই যে, ভাই আমার নামটা একটু দেখে দেবেন!, নাহিদ, রোল নম্বর ৫৬৭। ছেলেটি ২০পর্যন্ত নাম দেখেছিল শেষ পর্যন্ত দেখে বললো, কই দেখছি না তো? আমার তো বিশ নাম্বারে নাম আছে। দাঁড়ান, আবার শুরু থেকে দেখি। দেখতে দেখতে হতাশ হলো। হঠাৎ ১৯শে এসে দেখতে পেল নাহিদ নিশাত। yes, your name is there নাহিদ নিশাত! নাহিদ আনন্দের আত্মহারা। তারপর দুজন ওখান থেকে বের হতে চেষ্টা করলো। প্রচন্ড চাপের মুখে ছেলেটি পথ করে নিল। নাহিদ তাকে অনুসরণ করে বের হয়ে এলো। সিড়ির নিকট এসে দেখলো চৈতালী ধূলোর ঝড় উঠেছে। ঝাপটায় দৃষ্টি অস্বচ্ছ। তার সাথে যুক্ত হচ্ছে মেঘের ঘনঘটা। 

নাহিদ থাকে গ্রীনরোডে। সবাই ছুটে চলেছে। ঝড়ো হাওয়া, অন্ধকার, যানবাহন নেই। ছেলেটি নীলক্ষেতের দিকে এসে একটি ধাবমান রিক্সা জোর করে ধরে নাহিদকে তুলে দিল। আর সে নিজে উল্টো দিকে যাত্রা করলো মালিবাগের বাসার উদ্দেশ্যে। 

কয়েকদিন পর ক্লাশ আরম্ভের চিঠি পেল ওরা। দুরু দুরু বক্ষে ছাত্রছাত্রীরা এসে হাজির। অফিস থেকে এসে জেনে নিল কোথায়, কত নম্বর কক্ষে তাদের ক্লাস হবে।

দিন যায়। পড়াশুনার প্রচন্ড চাপ। তারই মাঝে ছেলেটির সঙ্গে নাহিদের দেখা হতে থাকে। নাহিদের রোল নম্বর ১৯, সাজ্জাদ সুমনের ২০, তারা পরপর রোলকলের জবাব দেয়। বেশ মজা পায়। এক সঙ্গে ক্লাসে ঢোকে, এক সঙ্গে বের হয়। পড়াশুনার আলোচনা তো হয়ই। দুজনেই মেধবী। সুতরাং বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন গড়ে উঠে। দীর্ঘ দু’বছরে তাদের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। এখন একজন আরেকজনকে না দেখে থাকতে পারেনা। একসঙ্গে ঘোরাফেরা, লাইব্রেরিতে যাওয়া, ক্যান্টিনে খাওয়া – নিত্যদিনের রুটিন তাদের। এরমধ্যে ফাইনাল পরীক্ষা এসে যায়। দু’জনেই ভালভাবে পাশ করে। এবারও পরীক্ষার প্রাপ্ত নাম্বার কাছাকাছি। সুমন বলে ১৯ কম, তবুও ১৯ –এর  নম্বর বেশী। নাহিদ হেসে বলে সংখ্যা হিসাবে ২০ পরে আসে, সেজন্য তার নাম্বারও কম আসে। এরকম ভাবে ওরা মজাও করে প্রায়ই। সামনে সিএসপি পরীক্ষা। প্রচুর পড়াশুনা। তাদেরকে সবজান্তা হতে হবে। প্রস্তুতি নিতে থাকে দুজনেই। এরই মাঝে নাহিদের বিয়ের কথাবার্তা চলতে থাকে। নাহিদ দেখতে ভাল। সুতরাং বিয়ের প্রস্তাব প্রচুর আসছে। খবর শুনে সুমনের চমক ভাঙ্গে। সে কি যেন হারাতে যাচ্ছে।সে নাহিদকে জিজ্ঞেস করে, তোমার এ বিয়েতে মত আছে? হঠাৎ নাহিদ কেঁদে ফেলে। বলে, না, নেই। 

- তবে  প্রতিবাদ করো না কেন?

-আমার কথার দাম দেয় না কেউ। 

-সিএসপি পরীক্ষাটা দাও তো আগে।

-তারা বলেন যথেষ্ট হয়েছে। তোমার সিএসপি পরীক্ষা আটকাবে না। পড়তে থাক। ভাল পাত্র হাতছাড়া করা যাবে না। 

সুমন বলে তুমি কি আমার কথা ভাববে না? জবাবে নাহিদ কেবলই চোখের জলে ভাসে। সুমন বলে তুমি উচ্চ শিক্ষিত মেয়ে। বাবা মাকে বুঝিয়ে বল। তারা তোমার কথার গুরুত্ব দেবেন। 

নাহিদ সাহস সঞ্চয় করে তার মনের কথা বাসায় প্রকাশ করে। অভিভাবকগণ সাজ্জাদ সুমনের বাড়ির, পরিবারের খোঁজ খবর সংগ্রহ করে। সুমনের পিতা গ্রামের একজন স্কুল শিক্ষক। সম্ভ্রান্ত বংশ। তবে এখন পূর্বের অবস্থা নেই। অনেক ভাই –বোন। সবাই লেখাপড়া করছে। সুমন সকলের বড়। তার অনেক দায়িত্ব। নাহিদকে গ্রামে যেতে হবে। গ্রাম সে কোনদিন দেখেনি। নাহিদের পিতা সরকারি উচ্চপদস্থ অফিসার। ইপিসিএস (EPCS) সে যুগে। জীবন যাপনের তরিকা উচ্চ পর্যায়ের। 

সুমন দেখতে শুনতে ভাল। ছেলে ভাল। কিন্তু তাদের মতে এ ভাললাগা, বা ভালবাসা স্থায়ী হতে পারেনা। সুমনকে তাদের পর্যায়ে উন্নীত হতে অনেক সময় লাগবে। তাও যদি ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। সুতরাং এ বিয়ে হতে পারেনা। নাহিদ অনেক জেদ করে। অনশন করে। তাতে কোন ফল হয় না। তার মন এতই ভেঙ্গে পড়ে যে তার পক্ষে সিএসপি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব হয় না। লেখাপড়ার ইতি তার এখানেই।  

নাহিদের বিয়ে পাকাপাকি হয়ে গেল এক আর্মির ক্যাপ্টেনের সঙ্গে। সুমন সিএসপি পরীক্ষা দিল। রেজাল্ট ভাল হল। ভাল চাকুরী হল। নাহিদের বিয়ে হল। স্বামী পশ্চিম পাকিস্তানে বদলী হয়ে নাহিদকে সঙ্গে করে নিয়ে গেল। সুমন ‘শূন্য নদীর কূলে রহিল পড়ি।’ তার সোনার ধান অন্য লোকের নৌকায় বোঝাই হয়ে চলে গেল। সুমন সিভিল সার্ভিসে পশ্চিম পাকিস্তানের গোট্‌কি নামক স্থানে পোস্টিং পেল। কিন্তু সে গেলনা সেখানে। চেষ্টা তদবীর করে ইস্ট পাকিস্তানের এক জেলা শহরে ম্যজিস্ট্রেটের চাকুরী গ্রহণ করলো।

সময় চলতে থাকে অবিরাম। সুমনের ‘অন্তর আপনার মনে আপনি পুড়তে থাকে গন্ধ বিধুর’ ধূপের মত। নাহিদের স্মৃতির দীপশিখাটি তাকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে দগ্ধ করে। কাজে ব্যস্ত থাকে। বাকি সময় নাহিদের স্মৃতির সঙ্গে বসবাস করে। অন্যদিকে নাহিদের সংসার চলে স্বাভাবিক নিয়মে। প্রথম প্রথম সুমনের স্মৃতি নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ঘোরাফেরা করতো। ভাবতে চাইতো এই –ই তার সুমন। পরপর তার দুটি সন্তান হয়।  একজনের নাম রাখে সাজ্জাদ। আর মেয়েটির নাম রাখে সুমনা। 

এরই মধ্যে বেজে উঠে ঊনসত্তরের দামামা। পাকিস্তানের রাজনৈতিক আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। শেখ মুজিব বিপুল ভোটে জয়ী হয়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানী নেতারা তা মেনে নিতে অস্বীকার করে। চরম নির্লজ্জের মত তারা এই নির্বাচনের ফলাফলকে বয়কট করে। যার ফলশ্রুতিতে শুরু হয় ব্যাপক গণ জাগরণ। বাঙ্গালী ছাত্র সমাজ এবং শিক্ষিত সমাজ এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সারাদেশ একত্রিত হয়। ’৭১ এর ২৫শে মার্চ  মধ্যরাত্রে যখন পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করে, বাঙ্গালী জাতি তখন হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। পরে এক ভয়ংকর যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। বাঙ্গালীর ছেলে আর ঘরে থাকতে পারলো না। সাজ্জাদ সুমন যুদ্ধে যোগ দিল। কখনও দেশের ভেতরে, কখনও দেশের বাইরে কাজ করে। তার যে এত সাহস আর এত শক্তি ছিল তা সে নিজেও জানতো না। এক কাপড়ে মাসের পর মাস, কত ঝড়ে, জলে ভিজেছে। ভিজা কাপড় গায়ে শুকিয়েছে। পোকামাকড়ের কামড়, জোকের রক্ত শোষণের কত না ইতিহাস। কত ক্ষুধা, তৃষ্ণায় কাতর হয়েছে। তবুও অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে। 

এটা ছিল ৭১ এর শেষের দিকের ঘটনা। ওরা জামালপুরের বর্ডারে একটি আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তখন জানতে পারলো গ্রামের ভিতরে কয়েকটি বাড়িতে পাক বর্বর বাহিনী আগুন দিয়েছে। তারা দ্রুত এগিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে। খুব সন্তর্পণে ছোট্ট নদীটির ঢাল বেয়ে সুমনরা এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখে একটি মানুষ উপুড় হয়ে পড়ে আছে। ক্রুশে বোনা সাদা টুপিটি পড়ে আছে অদূরে। শ্বেত শুভ্র বস্ত্র তার ক্ষত –বিক্ষত। দেহে আঘাতের চিহ্ন। চাপ চাপ রক্ত তার দেহ ঘিরে। ওরা মুক্তি সেনারা লাশটি উল্টালো। সাজ্জাদ চমকে উঠলো। এ যে নাহিদের পরহেজগার পিতার লাশ। শ্বেত , শুভ্র চুল, দাড়ি, হাতে তসবীহটি তখনও ধরা। তাকে ঐভাবে রেখে অতি সন্তর্পণে উপরে গ্রামে চলে আসে। দেখে নাহিদের বাড়িটি ভস্মীভূত। কয়েকটি গজারী কাঠের খুঁটি তখনও নিভু নিভু জ্বলছে। ওরা তখন উত্তর দিকের জঙ্গলে চলে গেল। সেখানে ক্ষত –বিক্ষত মানুষ পড়ে আছে। ভোরের আলো ফুটে উঠছে দ্রুত। কে যেন পানি চাচ্ছে মৃদু স্বরে। কাছে গিয়ে দেখে এ যে নাহিদ! সেই সাদা মেয়েটি। দুটি বাচ্চা তার বুকের উপর মৃতের মত পড়ে আছে। সুমন টিউবওয়েল থেকে তার কোমরের গামছা ভিজিয়ে পানি নিয়ে নাহিদের মুখে দিল। ডাকলো, নাহিদ, নাহিদ। সে চেতনা ফিরে পেল। বললো, কোথায় আমার সাজ্জাদ, কোথায় আমার সুমনা?

-এই যে তোমার বাচ্চারা। দেখ, চেয়ে দেখ। ওরা ভাল আছে। 

নাহিদ চিৎকার করে উঠলো। কে, কে, কে কথা বলে? 

কে তুমি? 

সুমনরা তাদের সকলকে ধরাধরি করে নাহিদদের রান্নাঘরে নিয়ে এলো। সে ঘরটি একটু দূরে থাকায় দগ্ধীভূত হয়নি। সকলেই মহিলা আর শিশু। তবে জখম আছে সবারই । চুল দাড়ির ভেতরে সুমনকে চেনা সম্ভব ছিল না। তবুও নাহিদ বলে উঠলো, কে আপনি? সুমন বললো, আমরা মুক্তিযোদ্ধা। সাবধানে থাকবেন। আপনার বাবা নদীর ঘাটের কাছেই আছেন। বলেই ওরা নিমেষেই অন্তর্হিত হলো। সূর্য উঠার পূর্বেই যে তাদেরকে ক্যাম্পে পৌঁছাতে হবে। 

যুদ্ধের সময়ে নাহিদ লাহোরে অবস্থান করছিল। অবস্থা খারাপ বুঝে নাহিদকে তার স্বামী মেজর করিম ঢাকায় পাঠিয়ে দিল। সেটাই ছিল ভারতের উপর দিয়ে শেষ বিমান যাত্রা। তারপরই মেজর করিমের ইউনিট বর্ডার ডিউটিতে চলে গেল। নাহিদ ঢাকায় এসে অন্য সকলের সঙ্গে জামালপুরের গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। সুমনের মনের অবস্থা খুব খারাপ। ইচ্ছা করছিল, ঝড় হোক, ঝঞ্ঝা হোক, সাইক্লোন হোক -সব তার জীবনের দুঃখ কষ্টকে উড়িয়ে নিয়ে যাক। এ জীবন তার অভিশপ্ত জীবন। যুদ্ধে যদি তার মৃত্যু হয় সেটাই হবে তার জন্য মুক্তি। যেমন গত পরশু তার প্রিয় বন্ধু সাংবাদিক পিন্টু, আহত মুক্তিযোদ্ধাকে পিঠে করে বহন করে আনার সময় পাক সেনাদের পাতা ফাঁদে পড়ে প্রাণ দিল। অদৃষ্ট কেমন নিষ্ঠুর, মানুষ তা জানে না। না হলে নাহিদের সঙ্গে তার এই অবস্থায় সাক্ষাৎ হওয়ার প্রয়োজন ছিল কি? ছিল না। অথচ অতীতের নাহিদ হারানোর দুঃখজনক স্মৃতির সঙ্গে এই মর্মান্তিক দৃশ্য যুক্ত হলো কেন? নাহিদ, আমার প্রিয় নাহিদ, আমার  প্রাণাধিক নাহিদ, আমার জন্ম –জনান্তরের নাহিদ। কেন প্রথম দেখা হয়েছিল, কেন পুনরায় দেখা হলো? 

মুক্তিযোদ্ধাদের এসব চিন্তা করবার সময় নেই। পরবর্তী কমান্ডের আদেশে তারা বেরিয়ে পড়ে অন্য অপারেশনে, একটি ব্রিজের কাছাকাছি যেদিক দিয়ে এক প্লাটুন পাকিস্তানী সৈন্য অন্য একটি গ্রামে ঢুকে ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে। সেদিন গভীর রাতে তারা বিলের ঠান্ডা পানিতে ঝোপ ঝাড়ের নীচে লুকিয়ে কচুরিপানা মাথায় দিয়ে অপেক্ষা করছিল। গভীর রাতে পাক হানাদার বাহিনী এলো। মাইন ফিট করা ছিল ব্রিজের দুইপাশে। ব্রিজে উঠার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে। অনেক সৈন্য হতাহত হয়। যে সমস্ত যানবাহন পেছনে ছিল, তারা নিজের অস্ত্র দিয়ে চারিদিকে ফায়ার করতে থাকে। মুক্তিসেনারা ডুব দিয়ে দূরে সরে যেতে থাকে। কেউ কেউ আহত হলো। কেউ অন্য পাড়ে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলো। আর্মির গাড়ি চলে গেল। চারিদিক সুনসান।

‘সবকিছু একদিন শেষ হয়। যুদ্ধও একদিন থামে। সেই বিরতি কি শান্তি? ’ শান্তি না হোক স্বস্তি তো আনে।  আশাবাদী মানুষ ধ্বংস স্তুপের ওপর আবার ঘর বাঁধে, বাঁচার স্বপ্ন দেখে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ছিনিয়ে আনে একটি লাল সবুজ পতাকা। বিজয়ী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সাজ্জাদ সুমন দেশে ফেরে। বাড়ি – ঘর তাদের অক্ষত আছে। মাতা –পিতাও জীবিত আছেন। ভাই – বোন সকলেই যুদ্ধে গিয়েছিল তারা কেউ ফেরে নাই। যে ভাইবোনদের সংখ্যা দেখে নাহিদের পিতা ভয় পেয়েছিলেন!

সরকারি চাকুরী তো সুমনের আগেই ছিল। এবার রেড ক্রসে তার পোস্টিং হলো। বৃদ্ধ বাবা –মাকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসে সে নিজের কাছে। কারণ গ্রামের শূণ্য ঘরে তারা কেবল কান্নাকাটি করেই দিন কাটান। সাজ্জাদ সুমন অফিসে যাতায়াত করে। তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে। বাকী সময় কোথায় কার কি কি ক্ষতি হয়েছে –সে সব খোঁজ খবর সংগ্রহ করে।  

একদিন যখন সাজ্জাদ খুব ব্যস্ত তখন এক মহিলা দুই বাচ্চার হাত ধরে অফিসে আসে। তার কাছে প্রতিদিন কতশত লোক তাদের প্রিয়জনের খোঁজ খবর নেবার উদ্দেশ্যে আগমন করে। তাদের আশা, কোথাও না কোথাও তাদের লোক আহত অবস্থায় আটকে পড়েছে। একদিন না একদিন আসবেই।

নাহিদ ধীর পদক্ষেপে রেডক্রস অফিসে প্রবেশ করে অফিসারের ডেস্কের সামনে দাঁড়ায়। অফিসার ফাইল থেকে মুখ না তুলেই ইশারায় আগন্তুককে বসতে বলে। বেশ কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে প্রশ্ন রাখলেন, – কি চাই? নাহিদের বুকের ভিতর রক্ত ছলাৎ করে উঠে। সাজ্জাদ ও নাহিদের দৃষ্টি কোন এক চৌম্বক শক্তির কবলে পড়ে স্থির হয়ে রইলো দীর্ঘক্ষণ। কেউ কোন কথা বললো না। হঠাৎ নীরবতা ভঙ্গ করে নাহিদ কম্পিত কন্ঠে বলে উঠলো, মেজর কে. করিম নামের অফিসার এখন কোথায় আছেন? পশ্চিম পাকিস্তানে তার পোস্টিং ছিল পাঞ্জাবে। সাজ্জাদ দ্রুত হস্তে ফাইল বের করে। পাতা উল্টে –পাল্টে দেখতে থাকে পাকিস্তানে আটকে পড়া অফিসারদের নাম। হঠাৎ এক জায়গায় তার চক্ষু স্থির হলো। সাজ্জাদের হৃদপিন্ড কে যেন চেপে ধরলো। সে মাথা নত করে চোখ বন্ধ করে ফেললো। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে, নাহিদের চোখে চোখ রাখলো। দৃষ্টি এতই স্থির এবং শীতল, যে নাহিদ সহ্য করতে না পেরে মাথা নীচু করতে বাধ্য হলো। সাজ্জাদ একটি কালো বর্ডার যুক্ত কাগজ নাহিদের দিকে এগিয়ে দিল। কয়েক সেকেন্ড পর গায়েবী আওয়াজের মত গম্ভীর নিনাদ তুলে এক ভয়ংকর শব্দ উচ্চারিত হলো – 

Major K.Karim got killed in the western front during war.

...



Saturday, May 23, 2026

গল্প - জাগিয়া উঠিল প্রাণ

 জন্মের পর থেকেই শাকিলার বোনেরা শুনতে পায় তারা সব বোন। ইদানীং তাদের বাড়ির নাম হয়েছে ৭ বোনের বাড়ি। অনেকটা একই রকম ৭ বোন –কৃষ্ণকলি। রোগাটে পাতলা গড়ন। নাক খাড়া। চোখ পিঙ্গল বর্ণের। তার কারণ তাদের মায়ের রঙ ফর্সা এবং চোখের রঙ পিঙ্গল। অন্যদের দৃষ্টিতে ৭ বোন এক অদ্ভুত প্রজাতি, অন্য গ্রহের কেউ। যে কোন একজনকে দেখলে লোকে বলে ৭ বোনের বোন। তাদের নাম জানবার কারো আগ্রহ নেই। বড় হলেও শাকিলার বয়স মাত্র ১২ বছর। সে একটু চিন্তাশীল। অন্য বোনেরা হইচই করে, বকা খেয়ে দিন কাটায়। তাদের মাতা পিতা প্রকাশ্যেই তাদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। ভাল পোশাক, ভাল খাবার তারা কোনদিন পায়নি। তাদের মা তাদেরকে বাড়ির সব কাজ ভাগ করে দিয়েছে। ঘর –দোর, আঙ্গিনা পরিষ্কার করা, ঝাড়া –মোছা  করা, রান্নার যোগাড় দেয়া, বয়সে বড় শাকিলাকে রান্নার ভার দেয়া। বাসন –কোসন পুকুর ঘাটে বসে ঘষে –মেজে পরিষ্কার করে আনা। একটা বাসন পানিতে পড়ে গেলে ঘন্টার পর ঘন্টা ডুব দিয়ে চোখ লাল করে সেটাকে খুঁজে তুলে আনতে হবে। ছেলে নেই বলে গরু ছাগলের পরিচর্যা করা, বাবার জন্য খাবার নিয়ে মাঠে যাওয়া আরও কত কাজ। আর তিন ক্ষুদে বাহিনী মনের সুখে বড় বোনদের সাহায্য করে। খাওয়ার সময় শাক সবজির ভর্তা, কাঁচা লংকা সহযোগে ভক্ষণ করে। সকালের নাস্তা তাদের লবণ দিয়ে তৈরী শুকনো রুটি। তাতেই তারা অমৃতের স্বাদ পায়। 

এমন সময় একদিন সুবেহ্‌  সাদেকের সময় তাদের পরিবারে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটে। তাদের ৭  বোনের একটি ভাই জন্মগ্রহন করে। শান্তির দূত, আনন্দের দূত, সাতবোনের ত্রাণকর্তা। এতদিনে পরিবারের কর্ণধারের আবির্ভাব! বাড়িতে আনন্দ জয়জয়কার। সাত বোনের নয়নের মণি। শতকাজের মাঝে তারা ভাইটিকে মাথায় করে রাখে। 

বাবার কাছ থেকে ভাল ব্যবহার তারা কোনদিন পায়নি। এবার শাকিলা একটু বড় হয়েই স্কুলে যায়। পরবর্তীতে ছোট বোনেরা যেত। বাবা খুব রাগ দেখাত। ছোট ভাইটির জন্ম হওয়ার পর বাবার মেজাজটা একটু নমনীয় হয়। 

ওরা সাত বোনই স্কুলে যায়। পড়ে সাত ক্লাসে। তারা সকলের হাসির পাত্র। কিন্তু সেদিকে ৭ বোনের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তাদেরকে সকলে সার্কাস পার্টির লোকের মত দেখে। কিন্তু পড়াশুনায় তাদেরকে কেউ পেছনে ফেলতে পারেনা। এলো বার্ষিক পরীক্ষা। ৭ বোন নিজের নিজের ক্লাসে সকলকে টপকে উপরের ক্লাসে উঠে গেল। ওদের সাফল্যে সবার ঠাট্টা – মসকরা বন্ধ হয়ে গেল।

স্কুল ছুটির পর ওরা বাড়ি এসে সব কাজ করে, ভাইটিকে দেখে, রাতে পড়া তৈরী করে। শাকিলা তাদের গাইড, তাদের মাস্টার। তাদের পিতামাতার সেদিকে খেয়াল নেই। ওদের বই নেই, খাতা নেই, কলম নেই, কাগজ নেই। শাকিলা পুরাতন বই যোগাড় করে বোনদের জন্য। যেটা নেই নিজে লিখে দেয়। নিজের বই –পত্র রাখে পরের বোনটির জন্য। এভাবে সব বোনেরা ছোট বোনের জন্য বই –খাতা রাখে। পড়ার পরিবেশ নেই বাড়িতে। পড়তে দেখলে বাবা বলেন, তেনারা জর্জ –ব্যারিস্টার হবেন। গায়ের রঙ যাদের হাড়ি –পাতিলের মত, তাদের এত পড়ে কোন লাভ হবে না। পরের ঘরে টিকে থাকতে হলে কাজ জানতে হবে। 

মায়ের গায়ের রঙ ফর্সা। তা সত্ত্বেও মেয়েদের গাত্রবর্ণ কৃষ্ণবর্ণের, বাবার মত। নিজের গায়ের কালি মোছার জন্য সপ্তগ্রামের ওপার হতে ফর্সা মেয়ে আমদানী করা হয়েছিল, বিয়ে করে। কিন্তু বিধির বিধান খন্ডায় কে?

শাকিলার নেতৃত্বে বোনেরা সব একে একে স্কুল ফাইনাল পাশ করে চলে যায় উচ্চশিক্ষার পথে। যদিও সে পথ মোটেই মসৃন নয়। গ্রামের স্কুলের এখন খুব নাম কেবল এই ৭ বোনের জন্য। তাদের ভাল পোশাক নেই। তবুও তারাই শ্রেষ্ঠ। 

অন্ধকার কুসংস্কারাছন্ন গ্রামে, পশ্চাদপদ পরিবারে তারাই আলোর মশাল জ্বালায়। যে মেয়েদেরকে পরিবারের এবং সমাজের সকলে অভিশাপ মনে করতো, তারাই এখন সকলের মধ্যমণি। তাদের একমাত্র হাতিয়ার তাদের বুদ্ধি, বিদ্যা এবং মনের দৃঢ়তা। প্রচন্ড দারিদ্র্যের মধ্যে অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে যায় শাকিলা। সঙ্গে নিয়ে যায় তার বোনদেরকে এবং ভাইটিকে। তারা এখন সকলের পুরোভাগে আলোর বর্তিকা হাতে। সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শাকিলা সকলকে তাক লাগিয়ে দেয়। সম্মানজনক চাকুরীতে ঢুকে তার পরিবারকে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে চলে, যা কিনা হ্যামিলনের বাশরীওয়ালার মত এক অগ্রযাত্রাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। যে গন্তব্য সকলকে আলোচিত মানুষ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেবে। ৭ বোন জাগিয়ে তোলে পুরা জনপদকে। গ্রামের লোকেরা তাদের বাবা –মাকে সম্মান করে। এদিকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্য্যয়নকালে শাকিলার পরিচয় হয় একটি ছেলের সঙ্গে। ক্লাসের সেকেন্ড বয়। পড়ার প্রতিযোগিতা শাকিলার সাথে। তাদের প্রতিযোগিতা প্রণয়ে পরিণত হয়। তারপর এক শুভদিনে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয় তারা।

একদিন প্রত্যুষে তারা খিরু নদীর তীর ধরে হাঁটতে থাকে। চারিদিকে পাখপাখালিরা ডানা ঝাপটা দিয়ে জেগে উঠলো। নিজ নিজ কন্ঠের অনুশীলনে প্রভুর জয়গান করতে লাগলো। পূর্ব দিগন্ত নরম লালিমায় ভরে গেল নবারুণ সম্প্রাতে। তারা দুজনে একসঙ্গে গেয়ে উঠে –‘আজি এ প্রভাতে রবির কর/ কেমনে পশিল প্রাণের প’র/ কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাত পাখির গান/ না জানি কেনরে এতদিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।’           

...


Saturday, May 16, 2026

গল্প - এক কৌটা কেরোসিন

 ঝন ঝন ঝনাত –গভীর নিশিথের অখন্ড নীরবতা খান খান করে পিক্‌দানির উল্টো পিঠে রক্ষিত পিতলের কুপিটা বিকট আর্তনাদ করে উঠলো। কুপিটা ছিটকে পড়েছে। পাশের ঘর থেকে শ্বশুর –শাশুড়ি ও একটি শিশু তাল মিলিয়ে পরিবেশটাকে আরো জমকালো করে তুললো। তারপর সমস্বরে ভেসে এলো, 

–‘কি অইছে বউ? কি হইছে? রাইতেও তোমরা একটু শান্তিতে থাকতে দিবা না? কোন কুক্ষণে যে তোমার মত অলক্ষী বউ ঘরে আনছিলাম, তা আল্লাই জানেন।’ ভীত সন্ত্রস্ত বধুটি যথাস্থানে দিয়াশলাই না পেয়ে স্বামীর বালিশের নীচ থেকে তা আবিষ্কার করলো। আলো জ্বালালো। দেখলো আর বুঝতে পারলো যে ঘুমের ঘোরে যে বিড়ালটিকে আঘাত করেছিল, তারই প্রতিঘাতে এই ভীষণ কান্ডের সৃষ্টি। খানিকটা কেরোসিন তৈল গড়িয়ে পড়েছে মাটিতে। প্রকৃত ঘটনা কি তা জানার জন্য পাশের ঘর থেকে বিষমাখা অজস্র প্রশ্নবাণ ছুটে আসছে। শরাহত বধুটি ভীত কন্ঠে ছোট্ট জবাব দিল, ‘কিছু তৈল পইড়া গেছে, মা –জান!’ কিন্তু কথা শেষ হতে না হতেই শ্বাশুড়ীর বেশ কিছুদিনের পুঞ্জিভূত কথার বাণগুলো রুদ্ধমুখ নির্ঝরের মত বাঁধনহারা হয়ে প্রবল উচ্ছ্বাসে ধ্যানী –মৌনী রাত্রির সুগভীর স্তব্ধতাকে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ইথারের তরঙ্গে তরঙ্গে ছড়িয়ে পড়লো। ‘তোমার মত পোড়া কপালী আর কেউ নাই। তোমার কপালের বাতাসে এই কয়মাসেই আমার সংসারের সব ধুইয়া যাইতাছে গা। এই তো সেই দিনকা, কোলের পোলাডার লগে তামাশা কইরা সাড়ে চার টাকা দামের নতুন হারিকেনের চিমনিটা ফাটাইয়া ফেলাইছ। চাইল –ডাইল ধুইবার সময় সের খানিক পানির লগেই থাইক্যা যায়। নবাব সিরাজুদ্দোলার মাইয়া কিনা, হের লিগা কিছু গায়ে লাগেনা।’

তরুণী বধু রাহেলা শুধুই ভাবে আল্লাহ্‌ যদি তার ভাগ্যে তাই –ই লিখেছেন তবে কেন তাকে বধির করে সৃষ্টি করেন নি? আবার ভাবে, বধির হয়ে জন্মগ্রহন করলে, সে যাদেরকে ভালবাসে তাদের আদর সোহাগ থেকে বঞ্চিত থাকতো। তার অতি প্রিয় মানুষটিও বোধহয় শ্বশুর –শাশুড়ির দলে ভিড়ে যেত। না, ঠিক আছে। এমন বকাঝকা শাশুড়িরা বউদের করেই থাকে। তাতে রাগ করবার কি আছে? অনেক রকম চিন্তা করে নিজের মনকে সে বুঝিয়ে বললো, যে, স্বামীর কাছে থাকতে হলে তাকে সবই সইতে হবে। তাই সে রাত্রে স্বামীর ভাষাহীন নীরব সহানুভূতি নিয়ে ঘুমের দেশে পাড়ি জমালো।

নিরব পৃথিবী আবার জেগে উঠলো পরদিন প্রভাতে। চোখ মেলে চাইলো।  মুচকি হাসিতে পূর্বাকাশে রাঙা হয়ে উঠলো। ফুল ফুটলো। কিন্তু ঘুম কাতুরে দুটো কুঁড়ি যেন আজ সহসা ফুটতে চাইছে না। ওসমান, রাহেলার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো –শিগগির ওঠো। মা তো অহনাই উইঠা পড়বো। উঠ্‌, উঠ্‌। পাশের ঘর থেকে শিশুর ক্রন্দন ধ্বনি  ভেসে এলো। ধড়মড় করে উঠে বসলো রাহেলা। ওসমান বেরিয়ে গেল। গত রাতের ঘটনা স্মরণ করে রাহেলা শিউরে উঠলো। এত দীর্ঘ দিনটা যে আজ কেমন করে পাড়ি দেবে। পিতৃহীন দুলালী, মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে। তার মা তো তাকে কোনদিনও বকে না। ওসমানও বকে না। তবে ওসমানের মা –বাবা কেন তার ভুল ধরে। 

ক্রমে সূর্যিদেব তার আলোর রথ ছুটিয়ে সব মানুষকে কর্মচঞ্চল করে তুললো। রাহেলার শাশুড়িও জড়তা কাটানোর জন্য বৌকে একই কথা পুনঃ পুনঃ বলতে লাগলো। এক কুপি তেলের দাম দুই আনা। তোমার নবাব বাপের বাড়ি থেইকা আইন্যা ঢালবার পারনা? পরের জিনিসের তো দরদ নাই। এইডা খুব হস্তা! আমার কপালের দোষ। নাইলে এমন অভাগা বউ আইলো আমার ঘরে? খালি খাইবার যম। তোমারে আর রাখতাম না। তোমারে পাঠাইয়া দিমু। 

শেষের বাক্য দুটি রাহেলাকে প্রচন্ড ভাবে আঘাত করলো। দিনের পর দিন যদি তার অপরাধের বোঝা এমনিভাবে বেড়ে যায় –তবে সে কি করবে? তাই সে নিজের ভাগ্যকে বারবার ধিক্কার দিতে লাগলো। যদি তাই না হবে ওসমানের মতো স্বামী কে হারাতে চায়? অজ্ঞানেই হোক আর সজ্ঞানেই হোক, যেখানে একবার ফাটল ধরেছে, তা আর জোড়া দেবার নয়। কাজেই রাহেলা তার ভবিষ্যত চিন্তা করে আকুল হয়ে পড়লো।

দিনান্তে ওসমান বাড়ি ফিরলো। তখন ওসমানের কাছে বউ এর একদফা নালিশ পেশ করা হলো। চঞ্চল পৃথিবী আবার নীরব হলো। রাত্রি নামলো। সে তার সন্তানদের তার ক্রোড়ে আশ্রয় দান করলো। ওসমান আর রাহেলা মিলিত হলো। তারা যেন ক্ষণিকের জন্য দুঃখ ভুলে গেল। অন্যদিনের মত আজও তেমনি জোৎস্না প্লাবিত ছোট্ট আঙ্গিনা পেরিয়ে দিঘীর ঘাটে তারা উপস্থিত হলো। নিত্যকারের মত আলাপ হলো না। শুধু মনের কাছে মন ভীত হলো। কাছে আসতে পারলো না। রাহেলা কেবলই শুনতে পায় –তোমারে আর রাখতাম না। ওসমান বলে, আমি রাখলে তোমারে ছাড়ে কেডা? কিন্ত রাহেলা জানে পারিবারিক ব্যাপারে ওসমানের কোন ক্ষমতা নেই। রাহেলা কোনদিন তার স্বামীর কাছে কোন অভিযোগ জানাতো না। কিন্তু ওসমান সবই অনুমান করতে পারতো। এমনি ভাবে কিছুদিন চলে যায়। কালের পাতায় লেখা ঘটনা মুছে যায় অনেক। কিন্তু শাশুড়ির অন্তর থেকে আধা ছটাক কেরোসিনের দাগ আর শুকায় না। দিনের পর দিন এই বেদনা তাকে পাগল করে তোলে। তাছাড়া প্রতিদিন অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ঘটনা নিয়েও সে এটার আয়তন বৃদ্ধি করে চলছে। রাহেলার কচি মন দিনে দিনে অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে অকেজো হয়ে পড়লো। সে আর কোন রকমেই নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারলো না সেই পরিবেশে। এই অপরাধে অপরাধী হয়ে তাকে পরের দিনই মায়ের বাড়িতে চলে যেতে হয়। যাবার পূর্ব রাত্রিটি তার জীবনের চরম ও পরম রাত্রি হয়ে ধরা দেয়। সেই রাত আর সেই চাঁদ তাদের দুজনার জন্যই যেন সৃষ্ট। ব্যথিত, মথিত, বিক্ষুব্ধ দুটি চিত্তের সেতু বন্ধন। একজনকে আরেকজনের কাছে সমর্পণ করবার উপযুক্ত সময়। অন্তরে অন্তরে আলিঙ্গন। চোখে চোখ আর হাতে হাত রেখে কেবল নিবিড় করে গভীর ভাবে অনুভব করবার এই –ই সময় –এই মহিমাময়ী মৌনা রজনী। অনেক কিছুই বলার ছিল। কিন্তু কিছুই তো মনে আসছে না। তবে হ্যা, নিতান্ত ভাবেই তাকে দু’একটা কথা আজ বলতেই হবে। তাই রাহেলা ভাব বিহ্বল জগতের বাইরে এসে বললো, ‘আমাকে তো কাইল মায়ের কাছে পাঠাইয়া দিব, তুমি তো জানই। আমি তোমার কাছে চিঠি লিখুম। তুমি তো লিখতে জান না, কেবল পড়তেই শিখছো। চিঠির উত্তর চাইনা। আমার চিঠি পাইয়া তুমি যাইও। চিঠির কথা কেউর কাছে কইও না।’ উত্তরে ওসমান বলেছিল, ‘অত ভাইঙ্গা পড়ছ ক্যা? তুমি কাইল যাও। কয়েকদিন পরেই আমি তোমারে লইয়া আসবো। পরে দেখবা সব ঠিক হইয়া যাইব।’ আরো তার কথা বলার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু বাবা –মা যে রকমই হোক না কেন, তারা তো মুরুব্বী। তাই চুপ করে থাকলো। রাহেলা শেষ বারের মত নয়নের জলে ওসমানকে সিক্ত করে দিল। 

রজনী প্রভাত হলো। কিন্তু অন্যদিনের মত রাহেলা তার মায়ের কাছে যাবার আনন্দে আত্মহারা হলনা। যথাসময়ে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হল। মা মেয়েকে কাছে পেয়ে খুব খুশী হল। আদর করে ভরিয়ে দিল। 

গেল বেশ কিছুদিন। রাহেলা ক্রমে ক্রমে অসুস্থ হতে চলল। কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না! অবস্থা খারাপ হতে খারাপতর হতে লাগলো। রাহেলার মা ব্যস্ত হল। রাহেলা স্বামীর স্মরণে স্মারক লিপি রচনা করলো। কোন একটা হিতাকাংখী কর্তৃক পত্রখানি ওসমানের নিকট প্রেরিত হল। 

দুপুর গড়িয়ে গেল। ওসমান লাঙ্গল তুলে গরু ছেড়ে বাড়ির দিকে রওনা হল। আজ তার মনটা ভাল নেই। কোন কাজেই মন বসছে না। তাছাড়া একটা কাক তার মাথার উপর দিয়ে কা –কা কর্কশ রবে উড়ে গেল। ওসমানের অন্তর আর্তনাদ করে উঠলো। সকালে ঘর থেকে বের হবার সময় তার মাথাটা  চালের সঙ্গে ঠুকে গিয়েছিল। এ সমস্ত মোটেই ভাল লক্ষণ নয়। তবে কি তার রাহেলার অসুখ করেছে! তার তো চিঠি পাঠানোর কথা ছিল। আর চিঠি লিখলেই বা এত তাড়াতাড়ি চিঠি নিয়ে কেউ আসবে না। এসব ভাবতে ভাবতে একবার হোঁচট খেয়ে কোনক্রমে টাল সামলে নেয়। এমন সময় একটা লোক এদিক ওদিক তাকিয়ে তার হাতে একটি পত্র গুঁজে দিল। ওসমানের বুকটা ধড়াস করে উঠল। সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে চিঠি নিয়ে বসে পড়লো। কাঁচা বড় বড় হরফে লেখা সে পড়তে শুরু করলো। 

প্রিয়তম, 

সারা জীবন তোমাকে যাহা দিয়া আসিয়াছে আজ তাহার ব্যতিক্রম হইবে না। আমি জানি তুমি আজও তাহাই গ্রহণ করিবে। তোমাকে ছাড়িয়া আসিতে খুব কষ্ট হইয়াছে। আমি দিনরাত কিছুই চিন্তা করিনা। কেবল পূর্ণিমা রাতের সেই হাসিমাখা মুখটার দিকে চাহিয়া থকি। তুমি এখানে আসিলে তোমার সাথে প্রাণ খুলিয়া কথা বলিতাম। তুমি যে ছল করিয়া আমার হাসি দেখিবার জন্য রান্না ঘরে বার বার আগুন আনিতে যাইতে তাহা আমার মনে পড়ে। এখানে তোমাকে, হাসিয়া কথা বলিলে কেহ তিরস্কার করিবে না।

আমার শরীর অত্যন্ত দুর্বল। তোমাকে দেখিতে খুব ইচ্ছা হয়। হাতের লেখা দেখিলেই বুঝিতে পারিবে আমার শরীর কত খারাপ। অনেক সময় মনে হয় বাঁচিব না। আর না বাঁচলেই বা কি? আমার জীবনের দাম এক কুপি কেরোসিন তেলের চেয়েও কম। আমি মরিয়া গেলে মনে করিও আধা ছটাক কেরোসিন তৈল দৈবক্রমে মাটিতে পড়িয়ে গেল। আর তোমাদের যা কিছু আমার সঙ্গে ছিল, এখান হইতে লইয়া যাইও। দুঃখ করিও না। তোমার জীবনে সুখ আসুক আমি তাই কামনা করি। আর শেষবারের মত যা দেবার ছিল, তা কাছে পাইলাম না বলিয়া বাকী রহিল। 

ইতি –ভাগ্যহীনা রাহেলা

চিঠি পড়া শেষ হল। ওসমানের মাথাটা যেন একবার ঘুরে উঠলো। সে বাহ্যিক জ্ঞানহারা হয়ে পড়লো। উর্ধ্বশ্বাসে রাহেলার কাছে ছুটে চললো। অনেক দূর দৌড়াবার পর সে রাহেলার বাড়ির কাছে এসে হঠাৎ থেমে গেল। দেখলো অনেক লোক জড়ো হয়ে কার যেন জানাজা পড়ছে!

২০.০৮.১৯৬১

রাত ১টা  


Saturday, May 2, 2026

গল্প - বেদনার কালিদহে

রাস্তার পাশের বাড়িতে বসবাস করবার উপকারিতা আছে, মজাও আছে। লক্ষ্য করলে দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একই লোক একই  সময়ে ঐ রাস্তায় চলাচল করে। প্রায় প্রতিদিনই দেখতাম একটি লোক ধীরে ধীরে হেঁটে এসে রিক্সায় উঠতো। পরিধানে তার লাল কালো অথবা নীল রঙের পোশাক। আপাদমস্তক। অর্থাৎ তার লুংগি, কুর্তা, পাগড়ি একই রঙের। লম্বা, ফর্সা, বৃদ্ধ, শীর্ণকায়া লোকটি। দীর্ঘদিন একই দৃশ্য অন্তরে কৌতূহল জাগায়। একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে, সে একজন কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্ত ব্যক্তি। বহুকাল ধরে এই কবরস্থানের পাশে এই দীঘির ঘাটে বাস করে। দীঘির ঘাটটি শান বাঁধানো। গম্বুজ বিশিষ্ট একটি স্নানঘর আছে, সুদৃশ্য। বিরাট পুকুরটি অতীতের কোন ধনবান ব্যক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কেবল ঘাটই নয়, পুকুরটির চারপাশ নক্সা করা দেয়ালে ঘেরা –সুরক্ষিত ও বটে। পুকুরটির তিন দিকে কবরস্থান। সম্প্রতি কবরস্থান উঠে যাওয়ায় পুকুরের অপর পাশে ঐ বিরাট বটবৃক্ষের গোঁড়ায় তাকে থাকতে দেয়া হয়েছে। লোকটি এখন রোগমুক্ত। লোকটির নাম করম আলী শাহ্‌।           

ভূমিষ্ঠ হয়েছিল মুষ্টিবদ্ধ হাতে বাঁচার অংগীকার নিয়ে। সেদিন সমারোহ না হোক, অনন্দ হয়েছিল তাদের গৃহে। কারণ সে ছিল পিতামাতার পুত্র সন্তান। আশার আলো জ্বলবে ঘরে, সংসারে আনয়ন করবে সমৃদ্ধি আর উন্নতি।

করম আলী শাহ্‌ বাঁচার জন্য এসেছিল। বেঁচেও ছিল অনেকদিন। কিন্তু সে বাঁচা কেমন বাঁচা, আমার গল্পে তাই –ই ব্যক্ত হয়েছে। করম আলী শাহ্‌ এক অভিশপ্ত ব্যাধির শিকার হয়। যার নাম কুষ্ঠ। টগবগে যুবকের আলোক লতার মতন ঝলমলে জীবন। শক্তিতে, আবেগে, আনন্দে, উচ্ছ্বাসে ভরপুর যৌবনে, জীবন তরী বেয়ে যায় সে। হঠাৎই একখন্ড কালো মেঘ কোথা হতে উড়ে এসে তার উপর ছায়া ফেলে। করম আলী শাহ্‌’র অসুখ ধরা পড়ে। ঘনঘোর অন্ধকারে এক ঘূর্ণিঝড় তার জীবন নৌকাখানিকে প্রচন্ড বেগে কয়েক পাক ঘুরিয়ে জলদেশের অতলে কোথায় নিয়ে গেল, কে জানে! তারপর শুরু হল তার দুর্বিষহ জীবন। আপন গৃহ, আপন পরিবার হতে বিতাড়িত হয় সে। প্রথমে নির্জন নদী তীরে পর্ণকুটিরে বন্য পশু পাখিদের সঙ্গে বসবাস। পরে সেখান হতে বহিষ্কৃত হয়ে পরবাস অর্থাৎ গ্রাম ছেড়ে শহরে। যেখানে সবাই পর, কেউ আপন নয়। অবস্থাপন্ন ঘরের সন্তান হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন। ভিক্ষা গ্রহণ করবার মত ঘৃণ্য কাজ যে আর নাই –তা সে কল্পনাও করতে পারে নাই। কাজটি বড় কঠিন কাজ। মানুষ বড় নির্দয়, ভিক্ষা দিতে চায় না। তবুও পেটের দায় বড় দায়। 

ইচ্ছে করে মানুষ মরতে পারে না। করম আলী শাহ্‌ এই রোগগ্রস্ত দেহ ত্যাগ করবার জন্য প্রস্তুত ছিল। যমদূত অন্যদিকে ব্যস্ত থাকায় তার কথা ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু জীবন তাকে ছাড় দেয়নি, মৃতের চাইতে অধম করে রেখেছিল। দীর্ঘকাল রোগ ভোগের পর রোগমুক্তি হয়েছিল তার। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া হস্তপদের অনেকাংশ ফেরৎ পায়নি সে। হয়নি তার মনুষ্য সমাজে পুনর্বাসন। মানুষ হিসাবে সে আর স্বীকৃতি পায়নি। পরিত্যক্ত মনুষ্যরূপী প্রাণী হিসাবে খাদ্যের অন্বেষণে দিন কাটাতো। রাতে কবরস্থানের এক কোণে মৃতদের পাশেই নিদ্রার আবেশে ফেলে আসা অতীতের স্বপ্নীল জীবনে ঘুরে বেড়াত। সেই সুদূর অতীতে প্রায় ৭৫ বৎসর পূর্বে সে লিখতে পড়তে শিখেছিল। সন্ধ্যায় দোকানে বসে কন্ঠের দরদ দিয়ে পুঁথি পাঠ করতো। গ্রামের লোকদের চিঠি পড়ে দিত। তার কন্ঠে মধু ছিল, হৃদয়ে আবেগ ছিল, চেহারায় সৌন্দর্য্য ছিল, অন্তরে সৃজনশীলতা ছিল। কোথায় গেল সব!

আমার বাসস্থান হতে প্রায় ৫০০ গজ দূরেই ছিল তার জীর্ণ কুটির। সেই কবরস্থানের পাশে সেই বিরাট রাজকীয় দীঘি। তার অপর পাশে এক কোণে আছে এক বিরাট বট বৃক্ষ। শতবর্ষের প্রাচীন তো বটেই। বিশাল এলাকা জুড়ে তার শাখা প্রশাখা বিস্তৃত। তার গুড়িটির পরিধিও খুব বড়। তার বৃহৎ মূল মৃত্তিকার বহু গভীরে প্রোথিত। বৃক্ষের গোঁড়া ঘেঁষে ছিল করম আলী শাহের ক্ষুদ্র নিবাস। ঘরের ভেতর একটি টিনের মাঝারি সাইজের ট্রাংক। আর তার দৈনন্দিন ব্যবহার্য দ্রব্যাদি। আর ছিল গাঢ় নীল, গাঢ় লাল আর কালো বর্ণের লুঙ্গি,পাঞ্জাবী,পাগড়ির সেট। প্রতিক্ষণের সঙ্গী একখানি লাঠি, ঝোলা আর পানীয় জলের ছোট একটি ক্যান।

তারপর বেশ কিছুদিন আর তাকে রাস্তায় যাতায়াত করতে দেখিনা। যে লোকটি আমাকে করম আলী শাহের খবর দিত তাকে জিজ্ঞেস করায় সে উত্তর দিল, সে তো বহুদিন আগে, বছরখানেকের উপরে হবে, চলে গেছে। বললাম, চলে গেছে মানে? 

- কোথায় চলে গেল?

- তিনি তো মারা গেছেন!

- মারা গেছেন? কই শুনিনি তো?

- শুনবেন কি করে। গরীব মানুষ, অসুস্থ, বয়সের ভার। উঠতে বসতে পারছিলেন না। তারপর একদিন...।

- আমার কন্ঠের ব্যাকুলতা দেখে লোকটি আর কিছু বললো না। 

করম আলী শাহ্‌ যে জনমানবহীন কবরস্থানের পাশে আস্তানা গড়েছিল, সেখানে এখন একটি পীরের মাজার ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। মৃতের সমাধিস্থলে এখন গড়ে উঠেছে জীবন্ত মানুষের আধুনিক সুদৃশ্য আবাসিক অট্টালিকা। সেজন্য আবাসিক এলাকা পাহারা দেবার জন্য করম আলী শাহের আস্তানার অদূরেই ছিল সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা রক্ষীদের ব্যারাক। ওরাও তার খোঁজ খবর রাখতো। একটি লোক নিয়োগ করেছিল করম আলী শাহ্‌ নিজেই। সেই তাকে দেখাশুনা করতো, রান্না বান্না করে দিত। তখন করম আলী শাহ্‌’র চলাফেরার ক্ষমতা ছিলনা। বাইরেও যেতে পারতো না। 

লোকটি আরোও বললো, তার কেউ ছিলনা। সরকারি কবরস্থানে তার দাফন হয়েছে। মৃত্যু যাকে দয়া করে নাই, জীবন তাকে মেরে রেখে দিয়েছিল। 

‘জিসে মওত নে  না পুছা

উসে জিন্দেগি নে মারা।’

জানিনা তার আত্মা এই মনুষ্য দেহ থেকে মুক্ত হয়ে কেমন আছে! 

মানুষের থাকে বাঁচার শখ। করম আলী শাহের ছিল মরবার শখ। রাস্তার পাশে বসে থাকতো মানুষের একটু দানের আশায়। মানুষেরা বড় নিষ্ঠুর, ভিক্ষা দিতে চায় না। করম আলী শাহ্‌ কত তরতাজা মানুষকে মরতে দেখেছে এই রাজপথে। কতজনকে দেখেছে প্রিয় স্বজন পরিবৃত্ত হয়ে সমাধিস্থলে যেতে। আজ এতদিন পরে আজরাঈলের সময় হলো। সে করম আলী শাহের দরজায় আঘাত করলো। ইচ্ছে ছিল যমদূতকে দেখবে। একবার –শেষবার। কিন্তু সে সুযোগ যে পায়নি। কেমন যেন ঘনঘোর অন্ধকার তার চোখের আলো কেড়ে নিল। প্রথম কুষ্ঠ রোগের সংবাদ শুনে যেমন তার চেতনার অবলুপ্তি ঘটেছিল, এবারও যেন তাই হলো। সেজন্য মৃত্যুর হীমশীতল পরশখানি তার উপলব্ধির বাইরে থেকে গেল। জীবন এবং মৃত্যুর কোন আশাই পূরণ হলো না। সবই সেই অচেনা, অজানা, অদৃষ্টের হাতে তোলা রইলো। নিঃসংগ করম আলী শাহ্‌ নিভৃতে, নিশীথে, নীরবে, নিঃশব্দে, নির্জন কুটিরে তার জীর্ণ, শীর্ণ, দীর্ঘ দেহখানি ফেলে রেখে চলে গেল। 

করম আলী শাহ্‌র ছোট্ট কুটিরের কি অবস্থা জানতে চাইলাম। লোকটি বললো, সে তো কবেই আর্মি এসে ভেঙ্গে পরিষ্কার করে রেখে গেছে। এটা আর্মির জায়গা তো! করম আলী শাহ্‌কে থাকতে দেওয়া হয়েছিল তার আশ্রয় ছিলনা বলে। 

অন্তরে বেদনা অনুভব  করলাম। একজন মানুষের জীবন কি? দীর্ঘকাল এই পৃথিবীর আলো বাতাসে জীবন সংগ্রাম করে অন্তিম মুহূর্ত অতিক্রম করে চলে গেছে। কেউ আজ জানবে না –এখানে কেউ ছিল! এই প্রাচীন বৃক্ষ তাকে আশ্রয় দিয়েছিল, ছায়া দিয়েছিল, বাতাস দিয়ে তার দেহমন শীতল করেছিল। সেই আশ্রয়দাতা বিরাট বটবৃক্ষই আজ করম আলী শহের জীবন –মরণের নীরব সাক্ষী। তারই দীর্ঘশ্বাস তার পত্র –পল্লবে মর্মরিত হয়।

তারিখ – ৪.১.২০১৪               

...


উৎসর্গ -সপ্তর্ষি

  উৎসর্গ   আমার পিতাকে যাঁর জীবনের পাথেয় ছিল আপোষহীন নীতি আর শৃঙ্খলা ।   আমার মাতাকে ছেলেমেয়েদের মেধা ও মননশীলতায় যিনি ছিলেন নিব...