Saturday, April 25, 2026

প্রবন্ধ - কাফেলা

 নদীর স্রোতের মত মানুষের জীবন। মহাকালের পথে সতত  বহমান, সঞ্চরমান। মানুষের জন্ম হয় বিধাতার ইচ্ছায়। শুরু হয় যাত্রা। ব্যক্তি পর্যায়ে তার যাত্রার বিরতি আসে। কিন্তু মহাকালের যাত্রায় নিত্য নব নব যাত্রী এসে সেই যাত্রায় যোগদান করে। এ যাত্রা অগণিত মানুষের যাত্রা চলছে তো চলছে, যেন কাফেলা। তীর্থ যাত্রীর দল। মানুষ মরে যায়, চলে যায়, না জানে কোথায়! তবুও চলতে থাকে বিয়ামহীন। তাতে কাফেলার কলেবর বিন্দুমাত্র হ্রাস পায় না। এই চলার পথের পথিকেরা কেউ সুস্থ, সবল, কেউ অবলা দুর্বল, অসুস্থ। তবুও বাধ্য হয়ে তাকে চলতে হচ্ছে। আর তো উপায় নেই, আর তো পথ নেই।

মানুষের জীবনে ঘাত –প্রতিঘাত আসে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জীবন হয় জর্জরিত। ক্রমাগত জীবন সংগ্রাম জীবনকে করে পর্যদুস্ত। মানুষের মধ্যে ষড়রিপু বাস করে। তার মধ্যে আছে মাৎসর্য নামে এক রিপু। সেজন্য দুর্বল যারা, দরিদ্র্য যারা, তারা সবলের হস্তে হয় নিপীড়িত, নির্যাতিত। অনাদিকাল হতে আজ পর্যন্ত এবং ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়া চলে আসছে, চলতে থাকবে। 

এই যাত্রী দল ‘দুর্গম গিরি, কান্তার মরু’ পার হয়ে চলতে থাকে সমুখ পানে। পেছনে ফেরার উপায় নেই। যাত্রীদের ধারণা পথ চলায় যত শ্রম, যত ক্লেশ, ততই পূণ্য অর্জন। পূণ্য অর্জন যদি নাই হবে, পহ চলা যে বৃথা হবে। অর্জনের ঝুলি থাকবে শূন্যতায় ভরা। সময়ের পথ চলতে চলতে অনেকে অবসাদ গ্রস্ত হয়। মিছিলের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনা। কারো গতি হয় শ্লথ, কেউ পড়ে যায়। কেউ আর উঠে দাঁড়াতে পারে না। 

যাত্রীদের কাউ হয়তো তার সুহৃদের জন্য ক্ষণিক দাঁড়ায়। কিন্তু স্রোতের টানে তিষ্ঠাতে পারেনা। ‘মোছাফির মোছ রে আঁখিজল, ফিরে চল আপনারে নিয়া।’ চোখের জল মুছে পথ চলতে থাকে সে। পথের ধূলিতে কে পড়ে রইল, কে চলে গেল চিরতরে, তার খোঁজ রাখতে পারেনা। 

পুরাতন চলে যায়। নতুন আসে। বিশ্ব বিধাতা সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষার জন্য এ বিধান তৈরী করেছেন। বিধাতার সংসারে সকলে তার সৃষ্ট জীব। সেখানে মাতা নেই, পিতা নেই, পুত্র নেই, কন্যা নেই। সকলেই আল্লাহ্‌র বান্দা। সৃষ্টি লীলার অংশ। যাদেরকে আমরা মাতা –পিতা  বলি তাদের মাধ্যমে তিনি তার সৃষ্টির ধারা বজায় রাখেন। সন্তান প্রকৃত পক্ষে পিতামাতার নিকট আল্লাহ্‌ তায়ালার আমানত। মা –বাবা মমতার বন্ধন দিয়ে সন্তানকে আল্লাহ্‌ তায়ালার অনুগত বান্দা হিসাবে গড়ে তোলেন। কি সমতলে, কি পাহাড় –পর্বতের পাদদেশে মানুষের সাধনা হয়ে দাঁড়ায় সন্তানকে সুশীল মানুষ হিসাবে গড়ে তুলবার। পরবর্তীকালে এই ছেলেমেয়েরাই ভবিষ্যতের মানুষ জন্ম দিয়ে যাবে বংশানুক্রমে। তারাও এ তীর্থ যাত্রীদের কাফেলায় শরীক হবে। সারা পৃথিবী জুড়ে এই কাফেলা চলতে থাকবে নিরবচ্ছিন্ন, নিরলস গতিতে। তারা কারও জন্য অপেক্ষা করবে না। কারো জন্য থেমে থাকবে না।‘Let the dog bark and the caravan pass.’এ প্রসঙ্গে কাহলিল জিবরান তাঁর The Prophet গ্রন্থে বলেছেন, ‘তোমার সন্তানেরা তোমার সন্তান নয়। তারা প্রবাহিত জীবনের আকুল প্রত্যাশার পুত্র –কন্যা। তারা তোমাদের মাধ্যমে আসে, কিন্তু তোমাদের ভেতর জন্ম নেয় না। তারা যদিও তোমাদের সাথে থাকে, তারা তোমার সম্পদ নয়।’ পিতা মাতার মাধ্যমে তারা আসে, তারা চলে যায়। তাদের বংশধরেরা একই পথ অনুসরণ করে তাদের প্রতিনিধি রেখে যায়। তাদেরো সেই একি পরিণতি। ওমর খৈয়াম তাঁর রুবাইয়াতের এক জায়গায় বলেছেন, ‘যদি নিয়ে নাও প্রভু তোমার বান্দাকে, তবে সৃষ্টি করবার কি প্রয়োজন ছিল? ’ বংশ পরম্পরায় সকল বান্দা মৃত্যুর অধীন। তবে জন্মানো কেন? বিশ্ব বিধাতার লীলা খেলা অংশ মানুষের জন্ম –মৃত্যু। আর তা একজন ব্যক্তি মানুষের সমগ্র জীবন। 

জীবনে কাছে এবং দূরে বহু মানুষ দেখেছি। তাদের জীবনের সুখের কথা, দুখের কথা শুনেছি। হাতে হাত রেখেছি, কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়েছি, অনেক পথ হেঁটেছি একসাথে, ফুল তুলেছি, গান গেয়েছি। পথ চলতে চলতে একজন, একজন, করে কে যে কোথায় হারিয়ে গেল! জানতে পারিনি। যারা একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিলাম, তারা অনেকে আজ নেই। 

কোথায় তারা? 

যেদিকে তাকাই কেবল নতুন মুখ, অচেনা, নামহীন, পরিচয়হীন জনতা। তবুও আঁখি কেবল খুঁজে ফেরে সেই পুরাতন সহযাত্রীদের মুখ। যদি কখনও দু’একজনের সাক্ষাৎ পাই, একে অপরকে শুধাই কোথায় তারা? সেই প্রশ্নের উত্তরে ওই সমুখের গোধূলি লগ্নের সন্ধ্যাতারার দিকে আঙ্গুলি নির্দেশ করে বলে, নাই নাই সে পথিক নাই। ঐ আকাশের তারাদের মাঝে ভীড় করে আছে। রেখে গেছে কেবল পদচিহ্ন – তাদের কীর্তি জীবনের বালুকা বেলায়।       

এই অভিযাত্রীদের মিছিল, এই কাফেলা তার পরিপূর্ণ দলবল নিয়ে ধীরে ধীরে সমুদ্র স্রোতের ন্যায় চলতে থাকে। কে গেলো, কে এলো; তার খোঁজ রাখে না। প্রতিদিন কত মানুষ –এই কাফেলা যাত্রী – মরে গিয়ে পথের ধূলায় লীণ হয়ে যাচ্ছে! আবার কতজনা জন্মগ্রহন করে এই কাফেলায় শরীক হচ্ছে। এটাই নিয়ম। এই দীর্ঘ মিছিলের যেমন শুরু নেই, তেমন শেষও নেই। 

কোন্‌ সাগরের তীরে মানুষের তীর্থ তা সে জানে না। তবুও পুণ্য লাভের আশায় মানুষ ঐ তীর্থ যাত্রী পথিকের দলে ভিড়ে যায়। তারপর একদিন বৃক্ষের হরিদ্রাভ পত্রের ন্যায়, পরিপক্ক ফলের ন্যায়, বৃন্ত হতে বিচ্যুত হয়ে ভূতলে পতিত হয়। সহযাত্রীর নয়ন ভরে উঠে জলে। ‘যেতে নাহি দেব –তবু চলে যায় ।’ আর আসে নাকো ফিরে। এভাবেই চলবে। একদল এই কাফেলায় যোগদান করবে, অন্যদল ঝরে পড়বে। কাফেলায় যাত্রীরা কেউ চিরস্থায়ী নয়। কেউ আসে, কেউ যায়। কাফেলার কলেবর ঠিক থাকে। সে চলবে চিরকাল। 

‘এ পথ যে চলার পথ, ফেরার পথ নয়।’ থেমে যাবার পথও নয়। জীবনের যা কিছু অর্জন, তার কষ্টার্জিত সম্পদ, যক্ষের মত বুক দিয়ে আগলে রেখেছিল, সব ছেড়ে সে চলে যায়। ক্লান্ত, শ্রান্ত পথিক আক্ষেপ করে বলে, 

‘হায়রে হৃদয়, তোমার সঞ্চয়,

দিনান্তে, নিশান্তে, শুধু পথপ্রান্তে, 

ফেলে যেতে হয়।            

নাই, নাই, নাই যে সময়।’

তারিখ –

১১.১.১১ 


Saturday, April 18, 2026

প্রবন্ধ - প্রলাপ

সর্বশক্তিমান স্রষ্টার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। সেই মানুষ কখনও এমন পর্যায়ে পড়ে যা সে নিজেই বুঝে উঠতে পারে না। বিংশ শতাব্দীতে মানুষ প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব চালাচ্ছে, মানুষের মনের উপর প্রভুত্ব চালাচ্ছে। একে অন্যের মনও জয় করছে। নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধির বলে অপরের মনের অবস্থা  হৃদয়ঙ্গম করতেও সক্ষম হচ্ছে। জীবনের সকল ক্ষেত্রেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিচ্ছে। অথচ এই বুদ্ধিমান মানবেরও এমন অবস্থা আসে যখন সে নিজে কোথায় আছে, কি ভাবছে, কি করা উচিৎ, কিছুই বুঝতে পারে না। তার অন্তরে সুখ থাকেনা, শান্তিও থাকে না। সে সর্বদা অস্বস্তি অনুভব করে। কিন্তু কেন, কি কারণে সে অপ্রার্থণীয় ‘মনো বেদনা’ তাকে পেয়ে বসে তা সে নিজে বুঝতে পারেনা। মন কি চায় তা সে খোলাখুলি বলতে পারেনা। আত্মার সেই অব্যক্ত ক্রন্দন  কেউ তো শুনতে পায়না। কেবল শুনতে পায় সে নিজে।

কিন্তু কই? সে শোনারও তো কোন অর্থ নেই। সেতো তার কোন অর্থ করতে পারেনা, সেই বেদনার ভাবকে ভাষায় রূপ দিতে পারেনা। কেন পারেনা? সেই কেন পারেনা-র দলে আমিও তো একজন। ধিক!। 

নিজেকে শতধিক! 

কেন আমি আমার মনের অব্যক্ত কথা প্রকাশ করতে পারিনা। আমি তো পাষাণ নই। আমি মানুষ। আমি এই ব্যাধিগ্রস্ত মানুষ হতে নিজেকে পৃথক করে নিতে চাই, কেবল নিজের মনকে দেখার জন্য।

কি সে?

কি চায় সে?

কেনই বা চায়? 

হয়তো তার প্রশ্নের যথার্থ জবাব খুঁজে না পেলেও ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। অনেক সময় বন্ধুদের কাছে আবোল তাবোল বকে যাই। তাদের তা অপ্রিয় লাগে তা জানি। তা জেনেও কেন এমন ভাবে নিজের মনকে সান্ত্বনা দেবার প্রয়াসে কেন অন্যকে উৎপীড়ন করতে যাই? যার কাছে মনের ভাব প্রকাশ করবো, সেই যদি প্রচন্ড মুষ্ঠাঘাত করে, আমার চঞ্চল, কম্পমান, দিশেহারা হৃদয়কে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দেয়, তবে আমি কি করবো? এমনভাবে বহুদিন আহত হয়েছি। কিন্তু কেন? আর নয়। এবার আমার মানসিক শান্তি, আনন্দ অক্ষুণ্ণ রাখার দায় আমাকেই নিতে হবে। নিজের সুখ, নিজের শান্তির ব্যাঘাত কেন ঘটাব?

হঠাৎ মনে পড়ে গেল আমিও না সৃষ্টির সেরা জীবদের একজন। তবে কেন এই অন্যায়ের প্রশ্রয় দেব? তাই মনে পড়লো আমার কাগজ আছে, কলম আছে, কালি আছে। তবে কেন আর অন্যের নিকট ব্যর্থ আব্দার করে ব্যথার বোঝা বড় করা? নীরব শ্রোতা হয়ে কাগজের সাদা, পরিষ্কার, পবিত্র বুকে এঁকে যাব আপন মনে। আসবেনা কোন প্রতিবাদ, না আসুক সহানুভূতি।

তাই আজ কাগজ কলমকেই একমাত্র অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করলাম। সে ভুলে যাবে না কিছুই। যেদিন অতীতকে জানতে চাইবো, ঠিকঠিক কথাগুলো সে জানিয়ে দেবে। মিথ্যে বলবে না একটুও। আমার খুব ভাল লাগবে। আজ সারাটা দিনই কেমন মনমরা হয়ে কাটালাম।কোন বিশেষ কাজ করিনি। সময়ের অপচয় বললে দোষ হবে না। নিছক আকাশ কুসুম কল্পনা করেই কাটিয়েছি। আর ভেবেছি মানুষের মন কতই না বিচিত্র। 

কেটেছে একেলা বিরহের বেলা

            আকাশ কুসুম চয়নে

সব কথা এসে শেষ হলো শেষে

          তোমারই দু’খানি নয়নে, নয়নে...

০৬/০৩/১৯৫৯   


Saturday, April 11, 2026

প্রবন্ধ - সংলাপ

পন্ডিত ব্যক্তিরা বলেন, অনন্তকালের মাঝে মহাসমুদ্রের বুদবুদের মত নাকি মানুষের জীবন। জন্ম এবং মৃত্যুর মধ্যবর্তী ব্যপ্তিকালকে জীবন বলা হয়। মহাকালের যাত্রাপথে প্রকৃতপক্ষেই মানুষের স্থিতি অতিশয় অল্প সময়ের। এই অল্পকাল জীবনটুকু একজন মানুষের সারাজীবন, দীর্ঘজীবন, চিরকাল। শৈশব, কৈশর, যৌবন, বার্ধক্য, মোটামুটি এই কয়টি জীবনের পর্ব । ধাপে ধাপে মানব সন্তান এসব পর্ব অতিক্রম করে তার আয়ুষ্কালের নাটকের যবনিকা টানে।

সৌরজগতে গ্রহনক্ষত্র সতত সঞ্চরমান। দিবাবসনে রাত্রি নামে। নিশি অবসানে ঊষার অভ্যুদয় ঘটে। এরই মাঝে মানবসন্তান জন্ম লাভ করতে থাকে। মহাশূন্যে জড়বস্তুরা কে কোথায় তখন অবস্থান করে, কে জানে? তবুও সেই জড় পদার্থ গ্রহনক্ষত্রই নাকি মানুষের জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যুর দিনক্ষণও স্থির করে দেয়। অর্থাৎ তার আয়ু, স্থিতিকাল রচিত হয় । 

এই আয়ু বা স্থিতিকালের মধ্যে মানুষ কি চায়? সুখ চায়, শান্তি চায়, ভালবাসা চায়, দীর্ঘদিন বাঁচতে চায়। বাঁচতে গিয়ে প্রতি পদক্ষেপেই অসুখ, অশান্তির সঙ্গে লড়াই করতে হয়। লড়াই করে কেউ জয়ী হয়, কেউ হেরে যায়। জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে একজন মানুষ হেরে যায় বা জয়ী হয় তা নয়। আর প্রতি মুহূর্তে জয়ী হয় তাও নয়।

Life is a pendulum between joys and sorrows, distress and happiness, hopes and despair. সুখ দুঃখ, শান্তি অশান্তি, জয় –পরাজয়, আশা –নিরাশা এসব পর্যায়ক্রমে মানুষের জীবনে আসে। সুখের পরে দুঃখ, দুঃখের পরে সুখ –এভাবেই জীবন কাটে। কারো সুখের পাল্লা ভারী, কারো বা দুঃখের। সেইদিক দিয়ে কেউ ভাগ্যবান, কেউ ভাগ্যহত। 

জন্মের পর মাতৃক্রোড় এক পরম সুখের স্থান। যারা মায়ের কোল পায় তারা পরম ভাগ্যবান। পরম স্নেহে, পরম নির্ভরতায় স্বর্গীয় বিমল আনন্দে কাটে তাদের শিশুকাল। হাঁটি হাঁটি পা পা করে মাতৃ ক্রোড় ছেড়ে নেমে আসে মাটিতে। তারপর বাটির অঙ্গন ছেড়ে প্রাঙ্গনে। তারপর বাল্যকাল, হাসি আর আনন্দ, খেলাধুলা, অক্ষরজ্ঞান লাভ, বিদ্যালয়ে প্রবেশ। পরে শুরু হয় মহাযজ্ঞ। জ্ঞান অর্জনের তপস্যায় ছাত্রজীবন গ্রহণ। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ধাপ অতিক্রম করে অগ্রসর হতে থাকে। পদার্পণ করে যৌবনে। যৌবন হচ্ছে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। ‘এখন যৌবন যার/সময় হচ্ছে তার যুদ্ধে যাবার।’ জীবনে যা কিছু অর্জন, এই যৌবনকালেই সম্ভব। যে যেমনই ব্যক্তি হোক, তার কিছু প্রাপ্তি –ভাল হোক, মন্দ হোক, সফলতা ব্যর্থতা – সব এই সময়ে অর্জিত হয়।

সুশীল তরুণ, জীবনের একটি লক্ষ্য স্থির করে। সেই লক্ষ্যে সে অগ্রসর হয়। নিজেকে প্রস্তুত করে। বিশেষ কোন লক্ষ্য না থাকলে সেই যুবক পথ হারায়। লক্ষ্য না থাকলে গন্তব্যে পৌঁছাবে কি করে? ধরা যাক কেউ শিক্ষক হতে চায়। তাকে মনদিয়ে বিদ্যা উপার্জন করতে হবে। পাঠ্য বহির্ভূত পুস্তকাদিতে মনোনিবেশ করতে হবে। নিজের অধীত জ্ঞান অন্যকে দান করবার ক্ষমতা আয়ত্ত করতে হবে। ‘যতই করিবে দান, তত যাবে বেড়ে।’ বিদ্যা দান করার মধ্য দিয়ে নিজের জ্ঞানের পরিধি বিস্তার লাভ করে। এভাবে একদিন সে সুশিক্ষক হওয়ার গৌরব লাভ করে।   

অন্যদিকে যদি সেই যুবক কোন রকমে পরীক্ষা পাশ করে আর কোন উপায় নেই বলে শিক্ষকের পেশা গ্রহন করে, তবে তার ফল হবে বিপরীত। জ্ঞানের ভান্ডার তার অপূর্ণ। সুতরাং দান করবে কি? পাঠ্যপুস্তকের একই সিলেবাস সারাজীবন ধরে আউরে তিনি নিঃস্ব হবেন। শিক্ষকতার আনন্দ বা গৌরব লাভ তার কোনদিন হবে না। রিক্ততাই তার জীবনের শেষ পাওয়া হবে। 

এরকম সকল পেশায় মানুষকে দক্ষ ও পারদর্শী হতে হবে। নচেৎ সফলতা আসবে না। সফলতাই জীবনের সুখ। নিজের ও পরের কল্যাণ সাধনই জীবনের সন্তুষ্টি আনয়ন করে। এই সন্তুষ্টিই আনন্দ। আনন্দই সফলতার বার্তা বহন করে। 

অনেকে বলেন গ্রহ, নক্ষত্রই মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে। যা ভাগ্যে আছে তাই হবে। সুতরাং সে ব্যক্তির করবার তেমন কিছু নেই। গ্রহ নক্ষত্র আসলেই ভাগ্য স্থির করে কিনা তা জ্যোতিষীরা জানেন। তবে এটি একটি বিতর্কিত বিদ্যা। 

অনাদিকাল থেকে মহাশূন্যে গ্রহ নক্ষত্র নিজেরাই অবিরত ঘুরপাক খাচ্ছে, তাদের কেন্দ্রের মহাশক্তিকে ঘিরে। আবর্তনের নিজস্ব ও নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। ভূ-পৃষ্ঠে ২৪ ঘন্টায় যত মানুষ জন্মগ্রহন করে তাদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণে এসব গ্রহ নক্ষত্রের কোন ভূমিকা থাকতে পারে বলে মনে হয়না। একই সময়ে জন্মগ্রহনকারী সকল জাতকের ভাগ্য একই রকম হয়না। সেইরকম একই ঘটনার শিকার সকল মানুষের জন্ম একই সময় হয়নি। তবুও অনেকে এসব গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থানের সময়ের সঙ্গে মানুষের জন্মের একটা সম্পর্ক স্থাপন করে দীর্ঘকাল গবেষণা করে তারা এক যোগসূত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করে। এরকম একটি চিন্তার চর্চা করে তারা হয়তো একটি লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। তবে কবে আসবে সেইদিন যেদিন জ্যোতিষিরা হস্তরেখা দ্বারা অনাগত ভবিষ্যতের সকল তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারবে। সকল বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করতে পারবে মানুষকে, সে আশা সুদূর পরাহত।

ভাগ্যের হস্তে সব সমর্পণ করে কেউ সাফল্যের পথে অগ্রসর হতে পারেনা। যে তরী যাত্রীকে তীরে ভিড়ায় সে তরীকেও চালনা করতে হয়। ভাগ্যে যাই থাকুক, মানুষকে তার অন্বেষণ করতে হয়। God has created food for the birds. But they are to fly for it. জীবনের পথকে নির্মাণ করতে হয়। তবেই সে পথে সে হাঁটতে পারবে তার গন্তব্যে পৌঁছার জন্য। একদিন পথের শেষে এসে দেখবে, ‘বেলা যে পড়ে এলো, জলকে চল।’ সময় শেষ। জীবনের অপরাহ্ন সামনে গোধূলী লগ্নের ম্লান আলো। জল নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা তার হিসাব কষতে হবে। হিসাব বরাবরই ভুল হবে, মিলবে না আর। চুপি চুপি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসবে বক্ষপিঞ্জরের ওপার হতে। তারপর একদিন নিজের চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক, হস্ত –পদ সব বিদ্রোহ করবে। মালিকের কথা আর শুনতে চাইবে না। অধীনস্তদের অধীনে নিজেকে সমর্পণ করতে হবে। সকল কর্ম সমাপ্ত। চুকিয়ে দিতে হবে সকল লেনা দেনা। তামাম শোধ। বিচরণের পরিধি সীমিত। ক্রমে গৃহকোণ, তারপর শয্যা। পদচিহ্ন আর কোথাও পড়েনা। অপেক্ষা করতে হয় জীবন নাটকের শেষ দৃশ্যের।

‘জন্মিলে মরিতে হবে/অমর কে কোথা কবে,

চিরস্থির কবে নীর/ হায়রে জীবন নদে।’

এ যে চিরন্তন বাণী। অনন্ত কালের ধারায় ক্ষণিকের জীবন। কত সুখ, কত দুঃখ, কত বিচিত্রতার ভিতর দিয়ে অতিক্রম করতে হয়।  একটু সুখের জন্য কত না সংগ্রাম করতে হয়। কঠোর পরিশ্রমে তৃপ্ত হয় এই ভেবে যে একদিন তার পরিশ্রমের সোনার ফসল তার গোলা ভরে দেবে। 

‘জীবন যেন পদ্মপত্রে নীড়।’ মৃদু সমীরণে কত না সহজে ঘটে তার পতন! এ যে অমোঘ, এ যে বিধান। জন্ম, জরা, মরণ!  

২০০১

 

Thursday, April 2, 2026

প্রবন্ধ - এলো খুশীর ঈদ

রমজান মাস শেষ। আগামীকাল ঈদ। আকাশে ঈদের বাঁকা চাঁদ মুচকি হেসে খোশ আমদেদ জানালো আমাদেরকে। আর কয়েক ঘন্টা মাত্র বাকী। নগরীর গৃহবাসী সব গভীর নিদ্রায় মগ্ন।স্বপ্ন দেখছে আসছে খুশীর দিনের, যার যার মনের মত শখের পোশাক, অলংকার, পাদুকা, ফিতা, চুল সাজাবার যাবতীয় দ্রাব্যাদি, অর্থাৎ কেশাগ্র থেকে পায়ের নখাগ্র পর্যন্ত সজ্জিত করবার যত উপকরণ সব ক্রয় করে নিয়েছে। খাদ্য দ্রব্যেরও ঘাটতি নেই। সব এখন ঘরে মজুদ। ভোর হওয়ার অপেক্ষায় গভীর ঘুমে স্বপ্ন দেখছে আনন্দের। 

আজকাল আনন্দ কোথায়? আনন্দ ছুটি নিয়ে চলে গেছে দূর দেশে। বেশীর ভাগ মানুষের বিষন্ন মুখ, মন খারাপ, মারামারি, হানাহানি করে দিন কাটায়। তাই আগামী দিনটির জন্য অধীর আগ্রহে সারাটি মাস এ বাজার, সে বাজার ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে যার যার সাধ্যের মধ্যে পছন্দমতো সবকিছু খরিদ করেছে। এ আনন্দ ঢেউ লেগেছে সুদূর পল্লী অঞ্চলে। সেখানেও কেনাকাটার ভিড়ে প্রাণ অতিষ্ঠ। তবুও খুশীর স্রোতে তারা তাদের ঝাঁপি পূর্ণ করে নিয়ে গিয়েছে ঘরে। সকলেই খুশীতে হাসিতে জীবনের ক্ষয়ে যাওয়া সুখগুলিকে ফিরে পেতে চায়। নেই কোন ভেদাভেদ, নেই কোন বিতরাগ। সকলে এক কাতারে দাঁড়ায়, সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করে। ধন্যবাদ জানায়, কৃতজ্ঞতা জানায়। তারপর শুরু করে ঈদের আনন্দ।   

সুস্বাদু খাদ্য গ্রহণের চাইতে জীবনে আনন্দের আর কিছু নেই। ঘরে ঘরে রান্নার খুশবু।সেমাই, জরদা, পোলাও, কোরমা আরও কত কি? ভোজন পর্ব শেষ করে এবাড়ি, ওবাড়ি বেড়াতে যাওয়া, দেখা সাক্ষাৎ করা, বুকে বুক মিলানো, অন্তরের ধরকন অনুভব করা। সে এক অনির্বচনীয় সুখ! মনে হয় প্রতিদিন যদি এমন দিন হতো! কেন হয় না? একটি শিশু বলে, মা রোজ রোজ ঈদ হয় না কেন? মা হেসে বলেন, রোজ রোজ ঈদ হলে এত আমোদ ফুর্তি হত না। স্কুলে যেতে হবে, হোমওয়ার্ক করতে হবে, আরও কত কাজ! ঈদের খুশী কখন করবে। সেজন্য ঈদ একদিনই ভাল। আনন্দ বেশী হয়। অপেক্ষা করে যে আনন্দ পাওয়া যায়, সেই আনন্দই মজার হয়, সুখের হয়। অনেকদিন মনে থাকে। সে ঈদের চাইতে পরের ঈদ আরো মধুময় হয়। ধৈর্য্য ধর। আবার ঈদ আসবে। 

এত হর্ষ, এত পুলকের আয়োজনের মধ্যে আজ রাতে দুইবার ভূকম্পন অনুভূত হলো। পূর্ব হতে পশ্চিম দিকে ধাক্কা দিয়েছে। সবাই ছুটে বেরিয়ে পড়েছে ঘর ছেড়ে। চেয়ার টেবিল একটার সঙ্গে আরেকটা ধাক্কা খাচ্ছিল। কি না হতে পারতো কয়েক সেকেন্ডে! এ যেন হরিষে বিষাদ। চোখের পলকে সব তছনছ হয়ে যেতে পারতো! আল্লাহ্‌র অশেষ দয়া যে তিনি এই ভয়াবহ বিপদ থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেছেন।

মানুষ যে ধর্মের হোক, যে বিশ্বাসের হোক, উৎসব পছন্দ করে। সে উৎসব হয় নানা ধরণের। ঈদ, পূজা-পার্বন, খৃস্টের জন্মদিন, ব্যক্তির জন্মদিন, পুত্র –কন্যার জন্মদিন। সবই খুশীর দিন। এসবই হর্ষ উৎপাদন বা আনন্দ দান করে। এর বাইরে উৎসব আছে। বন্ধু, আত্মীয়দের ডেকে তাদেরকে আপ্যায়ন করা, সুখ –দুঃখের অংশীদার করা – এসবই সম্যক তৃপ্তিদায়ক।      

ইচ্ছে থাকলে উপলক্ষ্যের অভাব হয় না। আয়োজন বিরাট হতে হবে এমন কোন কথা নেই। সাধ্যের মধ্যে মাঝে মাঝে হালকা নাচ –গান, কবিতা আবৃত্তি, গল্প, আড্ডাছলে উৎসবের আয়োজন করা যায়। না হলে মানুষের মন মরে যায়। জীবন বিষাদ্গ্রস্ত হয়ে পড়ে। বেঁচে থাকার নানান প্রশ্ন মনে আসে। উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না। আত্মীয়, বন্ধুদের বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ে। বন্ধুরা দূরে চলে যায়। একাকীত্ব ভর করে। অন্তর উদাস হয়। জীবন শূন্য মনে হয়। মনে হয় আমার কেউ নেই, কোথাও নেই! অবসাদ্গ্রস্ত জীবন নিজের ও পরিবারের বোঝা স্বরূপ। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এটাই সত্য? না, এটা সত্য নয়। সুখ, আনন্দ, খুশী, শান্তি, তৃপ্তি তৈরী করবার নিজেরও ভূমিকা আছে। নিজের উৎসাহই আসল। নিজেকে সেভাবে সকলের মাঝে স্থাপন করতে হবে। পরের তরে নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে। পরের পাশে দাঁড়াতে হবে। তবেই অন্যের হাত ধরা সহজ হয়। 

মানুষ একা বাঁচতে পারে না। নিজের সুখের জন্য মানুষে মানুষে মেলবন্ধন তৈরী করতে হয়। এটা সকলের জন্য সত্য। কারো একার কাজ নয়। যেহেতু আমরা ‘আশরাফুল মুখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব এবং বুদ্ধিমান জীব, সেজন্য আমাদেরকে একাজটি করতে হবে।‘প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’  মানুষের প্রতি, জীবের প্রতি, প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শনই আমাদেরকে সুখ, শান্তির পথে নিয়ে যাবে। আমাদের মানব জনম সার্থক হবে। ঈদ এবং অন্যান্য উৎসব আমাদের জীবনকে সুখ, শান্তি এবং সমৃদ্ধির সম্ভারে পূর্ণ করে রাখুক। আজকের এই ঈদের প্রক্কালে আমার এই একটি প্রার্থনা।


উৎসর্গ -সপ্তর্ষি

  উৎসর্গ   আমার পিতাকে যাঁর জীবনের পাথেয় ছিল আপোষহীন নীতি আর শৃঙ্খলা ।   আমার মাতাকে ছেলেমেয়েদের মেধা ও মননশীলতায় যিনি ছিলেন নিব...