Monday, July 27, 2026

উৎসর্গ -সপ্তর্ষি

 

উৎসর্গ

 

আমার পিতাকে

যাঁর জীবনের পাথেয় ছিল আপোষহীন নীতি আর শৃঙ্খলা

 

আমার মাতাকে

ছেলেমেয়েদের মেধা ও মননশীলতায় যিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ

 

আমার স্বামীকে

শিক্ষিত ও সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য

 

আমার ছেলেমেয়েকে

সবকিছুকে যোগ্য থেকে যোগ্যতর করার জন্য

 

আমার নাতি নাতনী ফারজাদ ফারহিনকে

তাদের সকল প্রয়াসকে সুন্দর ও সার্থক করার জন্য


 

Wednesday, July 22, 2026

মুখবন্ধ

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। স্বর্গ হতে বহিস্কৃত হয়ে আদম এই বিশ্ব প্রকৃতিকে কেমন দেখেছিলেন জানি না তবে অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। চারিদিকে সুন্দর আর সুন্দরের সমারোহ। বৈচিত্র্যে ভরপুর। তারপর দেখা পেলেন হাওয়ার। হৃদয় মন আত্মা তার নেচে উঠেছিল আনন্দে। তার হৃদয় নিঃসৃত সেই শব্দ এই শূন্য পৃথিবীতে বলাকার গতির ঝংকারের মতো দিক থেকে দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই শব্দতরংগ ভাষা না হলেও,কালি কলমে লেখা না হলেও, তাই–ই সুর, তাই–ই আনন্দ,শিল্প এবং সাহিত্য। সেই সুরের ধ্বনি একদিন ভাষায় রূপ নেয়।

অযুত বরষের পরে আমরা মানুষেরা নানান ভাষায় কথা বলি, গান গাই, অলংকৃত করে সাহিত্যে রূপ দান করি। সাহিত্য কেবল কথার সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করা নয়,নান্দনিকতাই নয়,মানুষের জীবনবোধকে উপলব্ধি করা তার বিশেষ একটি দিক। সাহিত্যের প্রধান কাজ মানুষের আত্মাকে অজ্ঞানতার অন্ধকার হতে বাইরে বের করে আনা,তার উপলব্ধিকে জাগ্রত করা,ভালমন্দের সাথে তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। মানুষকে সুন্দর এবং শান্তির স্বপ্ন দেখানো। 

আজকের বিশ্ব যখন হতাশা, অস্থিরতা, অন্যায়, অবিচারে অশান্ত, তখন সাহিত্য মানুষকে পথ দেখায়। মানুষের এই স্বপ্ন শান্তির পক্ষে,সুন্দরের পক্ষে,অসুন্দর এবং বিনাশের বিপক্ষে। মানুষের অন্তর যখন দুঃখ কষ্টে বিষাদে ম্রিয়মান হয় তখন মানুষ আশ্রয় খোঁজে সাহিত্যে,সংগীতে এবং কবিতায়। সৌন্দর্য্য মিশ্রিত শব্দ বলেই সেটি সাহিত্য। ঐ সৌন্দর্য্য মিশ্রনই শিল্প। সেদিক থেকে কথাশিল্পী একজন সাহিত্যিক।

 

শিল্পবোধের স্থান মানুষের মনে। রসবোধ না থাকলে শিল্প সৃষ্টি হয় না। ভাবনাকে ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে সঞ্চারিত করাই সাহিত্য চর্চা। মানুষ মাত্রেই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সুখ ও সৌন্দর্য্যের অনুভূতির পরশ পায়। সেই অনুভূতির প্রকাশ করবার অভিলাষ তাদের আছে। কেউ কেউ অনায়াসে মনের ভাব সৌন্দর্য্য রসে জারিত করে প্রকাশ করে। অনেকেই সাধনা করে হৃদয়ের শিল্পমন্ডিত ভাব প্রকাশ করেন। আমরা পাঠকগণ, সেই সব বাক্য বা সাহিত্য পাঠ করে আমাদের অন্তরের না বলা কথার বহিঃপ্রকাশ দেখে আনন্দ লাভ করি। নিজেকে নির্ভার মনে করি। 

‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইলো না কেহ।’ না শুধালেও আমরা সাহিত্যের মাধ্যমে সেই শৈল্পিক রস বোধের আস্বাদ পাই – তখন নিজেকে ধন্য মনে করি। মনে করি যা বলতে চেয়েছিলাম, তা এই সাহিত্যের মাধ্যমে ব্যক্ত হয়েছে।

‘সপ্তর্ষি’একটি সংকলন। নানারকম বিষয় বস্তু এই বইটির প্রান সঞ্চার করেছে। এই গ্রন্থটিতে সাতজন লেখকের অবদান রয়েছে। সুন্দর সুন্দর ভাবনা,বাস্তব জীবনের কথা তারা লিপিবদ্ধ করেছেন গদ্য,পদ্য,শায়েরী ও প্রবন্ধ আকারে। তাদের জীবন দর্শন ও অভিজ্ঞতা এই সংকলনের শ্রী বৃদ্ধি করেছে। এই সাতজন লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি,উপলব্ধি,সৃজনশীল প্রকাশ ভঙ্গি প্রশংসার দাবীদার। 

সাহিত্য চর্চা যারা করেন তারা ‘সুমনা।’ সৎ চিন্তা, সৎ কর্ম, সৎ দৃষ্টি ভঙ্গির উপর নির্ভর করে তারা লেখনী ধারণ করেন। নিজেদের হৃদয়ের কথা – সুখের হোক,দুঃখের হোক,প্রকাশ করে শান্তি লাভ করেন। অন্যদিকে পাঠককেও বাস্তব জীবনের কঠিন পরিস্থিতি থেকে ক্ষণিকের জন্য হলেও বের করে আনতে সক্ষম হন। মানুষ শান্তি চায়। শান্তিই বিরাম। শান্তিই অন্তরকে শীতল রাখে, জীবনকে সুখময় অনুভূতির স্পর্শ দান করে, নব আনন্দে,নতুন ছন্দে জীবন যাপনের চাবিকাঠি খুঁজে পায়। 

এই সংকলনের সাতটি নক্ষত্র তাদের আলোর বিচ্ছুরণে পাঠকদের আলোকিত করবেন এই আশা রাখি। পাঠকগণও নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করবেন। আনন্দ ও সমৃদ্ধি জীবনের কাংখিত বস্তু। এই গ্রন্থটিতে ৭২টি রচনা স্থান পেয়েছে। অনেক ঘটনা বহুল বাস্তব জীবনের কথা পাঠক হৃদয়কে আন্দোলিত করবে। তাই কম্পিত হস্তে পাঠকদের কাছে ‘সপ্তর্ষি’ গ্রন্থটি সমর্পণ করলাম। আপনাদের ভাল লাগাই আমাদের এই প্রচেষ্টার সার্থকতা।

ফিরোজা হারুন      

১৪ই সেপ্টেম্বর ২০২৩
৩০শে ভাদ্র,১৪৩০

Saturday, July 18, 2026

সূচিপত্র

 সূচিপত্র

ফিরোজা হারুন

কবিতা

স্বপ্নের শবাধার   

করোনা সমাচার  

কোভিড 19        

গল্প

আবর্তন           

কত অজানারে    

জীবনের বাঁকে    

এক টুকরো হাসি    

ছিন্ন বীণা          

জাগিয়া উঠিল প্রাণ   

এক কৌটা কেরোসিন   

বেদনার কালিদহে       

প্রবন্ধ

কাফেলা     

প্রলাপ       

সংলাপ      

এলো খুশীর ঈদ    

দাস প্রথা উচ্ছেদ হয়েছে কি?   

রানা প্লাজা    

স্মৃতিচারণ মূলক রচনা

আমাদের হেলেন আপা    

ডুলি প্রাচীন কালের বাহন    

মৃত্যুর মুখোমুখি    

Saturday, July 11, 2026

কবিতা - স্বপ্নের শবাধার

স্বপন দেখিনু এক           
      রজনীর শেষে
কে যেন ডাকিছে মোরে   
      বাতায়নে এসে
ওঠো ওঠো, চেয়ে দেখ,   
      নরম চাঁদের আলো
দূর করে দিয়ে গেছে,     
      জগতের সব কালো।
ঐ দেখি –
পৃষ্ঠদেশে একজন বহিছে
         সাদা শবাধার
ঃ কেন বহিছ শবাধার? পাওনি কো কিছু আর ?

শুভ্র চাঁদনী রাতে, শুভ্র শবাধার,      
           নিস্তব্ধ চারিধার
সময় পাইনি তার
         মুখাবয়ব দেখিবার!
শুধালাম তারে – কোন পরপারে
কি নিয়ে চলেছ পথিক কোন ঠিকানায়?
ঃ উন্মুক্ত করিয়া দেখ কে যায় কোথায়!

সাদা জোছনা,সাদা শবাধার, 
          সাদা চরাচর,
খুলে দেখি সাদা শব,  
         নিদ্রায় কাতর।
চম্কে উঠি,পিছে হটি, 
        এ যে চেনামুখ!
সারাটি জীবন দেখেছি যে তারে, 
            পেয়েছি যে কত সুখ!
শুধাই তাহারে পুনঃ –
কে তুমি? কেন তারে নিয়ে যাও 
              কোন সুদূরে?
ঃ আমিই তুমি,তুমি যে আমি, 
          চিনিলে না মোরে?

চমক ভাঙ্গিলো মোর,ঘন তমসার ঘোর, 
                     মোর চারপাশে
আমার শব আমিই বইছি, 
                     অস্তাচলের দেশে।

Saturday, July 4, 2026

কবিতা - ‘করোনা’ সমাচার

 কোথায় আল্লাহ্,কোথায় যীশু,

        কোথায় ভগবান?

কোথায় খোদা,কোথায় স্রষ্টা 

        কোথায় শয়তান?

কোথায় ইবলিশ,কোথায় নমরুদ

        কোথায় কামান,কোথায় বারুদ!

কোথায় জ্বীন,কোথায় পরী?

        কোথায় বাদশাহ্,কোথায় সম্রাট?

কোথায় কালাপাহাড়,কোথায় লুকিয়ে 

              বিখ্যাত চেঙ্গিস!

কেউ কি পারে না করতে বিনাশ 

            কভিড ১৯-বিশ?

কোথায় ফেরেশতা,জ্বীনের বাদশাহ্

         কাজ করে কিছু দেখাও তোমরা 

            হাজার বছরের প্রতি –শ্রুত সুরক্ষা।

কেউ আছে কি –

        কেউ কি আদৌ 

              ছিল কোনদিন?

সবদিকে চেয়ে,দেখি আজ যেন

          ব্যর্থ ট্রাম্প ও পুতিন।

নির্মম ভারী,নিষ্ঠুর মারি, 

        বড়ই কঠোর,বড়ই কঠিন, 

সুচতুর তারা আনতে ব্যস্ত  

        ফলস্ ভ্যাকসিন। 

কেউ থাকবেনা আর অসহায়,মানুষের পাশে দাঁড়াবার।                             

          চারিদিকে কেবলই মৃত্যুর হাহাকার!

কেউ নেই কোনখানে,

       কেউ ছিলনা 

          কখনো কোনদিন

শুধু আছে প্যানডেমিক

        বধিবারে প্রাণ,নির্বিঘ্নে নিশ্চিত।

করোনার করুণা চেয়ে 

        লাভ নেই আর,

        মৃত্যুর আঁধার ঢাকে চারিধার।

বিধাতার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ

        আশরাফুল মখলুকাত, 

             হতবাক আজ ! 

তাদের পৃথিবী কেড়ে নিল কারা –

             কোন মহারাজ?

এই ধ্বংসের জবাব 

        জানা নেই কারো আজ

বড়ই নির্মম,বড়ই নিঠুর,বড়ই নিলাজ,

উন্মত্ত নৃত্যে মত্ত আজিকে আজরাইল 

                   যমরাজ।

‘করোনা কভিড’ হবে সেই দিন শান্ত

রইবেনা যখন এ গ্রহে 

       একটি মানুষও জীবন্ত।

২৮শে মে, ২০২১


Saturday, June 27, 2026

গল্প - আবর্তন

পৃথিবীর প্রতিটি জিনিসই প্রথমে দুর্বল হয়ে জন্মায়। তারপর ক্রমে তার শক্তির বিকাশ হয়। পুনরায় সে শক্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তেমনি প্রতিদিন সূর্যও ভূ–গোলকের একটি স্থানে সূচিভেদ্য অন্ধকারকে তাড়িয়ে তার কোমল আলোর পরশে প্রাণিজগতের ঘুম ভেঙ্গে দেয়। ক্রমে তার আলো বা তাপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষকেও সে কর্মচঞ্চল করে তোলে। আবার ঢলে পড়ে, ক্লান্তিতে, পশ্চিম দিগন্তে। হয়ত বা বিশ্রাম নেবার উদ্দেশ্যে। তখন মানুষেরাও ক্লান্ত হয়ে আশ্রয় নেয় তাদের নিরালা শান্তিময় বিরাম কুঞ্জে। তেমনি সেদিনও সূর্যি মামা সারাদিন তার নিয়মিত কাজ সেরে দিনান্তে আশ্রয় নিতে চাচ্ছে। তার রক্তিম আভাটুকু তখনও ধরণীর বুক থেকে মুছে যায়নি। তার রশ্মিগুলো তির্যক ভাবে ধরণীর দিকে তাকিয়ে আছে। হয়ত বা বিদায়ের করুণ ব্যথাই তার বুকে বড় হয়ে বাজছে। এমনি পরিবেশে দ্বিতলের একটি কামরায় বসে ডা. রাশেদ যার ডাকনাম ফুল, মুক্ত বাতায়ন পথে সে চেয়ে আছে মহাশূন্যে। তার দৃষ্টি যেন অসীম অনন্তকে ছাড়িয়ে একটি মাত্র বিন্দুকে লক্ষ্য করছে। তাহলে বুঝা যাচ্ছে সে কোন একটি বিষয় গভীরভাবে চিন্তা করছে। সে হয়ত তার অতীত স্মৃতিকে রোমন্থন করছে –অমৃত লাভের সন্ধানে। কিন্তু তার ভাগ্যে অমৃত উঠবে না গরল উঠবে তা কে জানে?

ফুল আজ সারাদিন কিভাবে কাটালো? 

এই একটি দিনই তার জীবনের চরম মুহূর্ত নিয়ে অপেক্ষা করছিল। মনে পড়ে তার সকালের কথা। জরুরী ডাক পড়েছিল হাসপাতালে। তার নতুন চাকুরি। তবুও লোকের কাছে অল্পদিনেই পরিচিত হয়ে উঠেছে,লোকের আকর্ষণের বস্তু হয়ে উঠেছে। সে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল হাসপাতালে। একখানি লতানো দেহ বিপরীত দিকে মুখ করে শুয়ে আছে ‘বেড’ –এ । বুঝা গেল রোগী একজন নারী। ডা. ফুল রোগিনীর সামনের দিকে গেল।। সে রোগিনীর শীর্ণ হাতখানি ধরে ঘড়িতে হৃৎস্পন্দন দেখলো। তারপর মুখের দিকে তাকালো। তখন লক্ষ্য করলে দেখা যেতো ফুলের মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তার হৃৎপিন্ড খুব দ্রুত রক্ত সঞ্চালন করছে। মৃত্যু যেন তাকেই পেয়ে বসেছে। এমনি তার ভাবখানা। মুহূর্তে সে নিজেকে সামলে নিয়ে কর্তব্য কাজে মন দিল। বোধহয় তার সারাজীবনের ডাক্তারী বিদ্যা আজ কাজে লাগিয়ে এই অকাল মৃত্যুর গ্রাস হতে রোগিনীকে রক্ষা করতে হবে। কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে ফুল বুঝতে পারলো চেষ্টা বৃথাই মাত্র। আশা নেই। প্রদীপে তৈল নেই। তবুও সে হাল ছেড়ে দিল না। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। এসব চিন্তা করে সে একটি ইনজেকশান দিল। একটু পরেই রোগিনী চোখ মেলে চাইলো। কিন্তু তার দৃষ্টি পলকহীন ভাবে পড়ে আছে ফুলের মুখের উপর। তার ভাব দেখে মনে হলো সে যেন কি সুখের মরণ মরতে যাচ্ছে। সকলেই ভাবছে এই দৃষ্টির অর্থ নেই। কিন্তু ডাক্তার বুঝতে পেরেছে এই দৃষ্টির অর্থ। তারপর রোগিনী অতি কষ্টে মৃদুস্বরে উচ্চারণ করলো, 

-‘ফুল।’ 

কেউ বুঝতে পারছিল না তার কথা কেবল মাত্র ডাক্তার ছাড়া। 

-‘চলে যাচ্ছি চিরতরে আমার প্রিয় পৃথিবী ছেড়ে। চলে যাওয়াই উচিত। আরো আগেই যেতে হতো। তবে আজ বড় সুখ পেলাম। সে সুখ মৃত্যু যন্ত্রণাকেও জয় করেছে। দুঃখ করো না এভাবে তোমার সঙ্গে দেখা হলো বলে।’ 

শেষের কথাগুলো ভাল বুঝা গেলনা। ডাক্তারের নিষেধ সত্ত্বেও সে তার শেষ কথা বোধ হয় ডাক্তারকে শুনিয়ে গেল। তার কথা বলার শক্তি ধীরে ধীরে শেষ হয়ে এলো। মেয়েটি সুবোধ বালিকার মত শান্ত হয়ে এলো মেয়েটির স্বামী,আত্মীয়,পরিজন যারা কাছে ছিল, তারা সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। সবাই ডাক্তারকে আঁকড়ে ধরতে চায়। কিন্তু ডাক্তার নিরুত্তর। বহু কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক রাখে। মেয়েটি অত্যাধিক চঞ্চল হয়ে উঠলো। কি একটা বললো বোধগম্য হল না। সে তার নিঃশেষিত শক্তির সমস্তটুকু দিয়ে ডাক্তারের হাত ধরে থাকলো। ক্রমে সে নিস্তেজ হলো। তার শিথিল হয়ে যাওয়া হাত খুলে গেল। ডাক্তার আবারও তার নাড়ি দেখলো। উদাস দৃষ্টি মেলে আত্মীয়দের দিকে তাকালো। তাকে আস্তে আস্তে যত্নের সঙ্গে শুইয়ে দিল। তারপর দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আরও দ্রুত পদ সঞ্চালন করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডক্টর্স্ কোয়ার্টাসে তার কামরায় পৌঁছে গেল। তখন দেয়াল ঘড়ি ঘোষণা দিল ঢং ঢং ঢং। ফুল এতক্ষণ পর হাত ঘড়ির দিকে তাকালো। দেখলো সত্যি তিনটা বাজে। সে বসে বসে ভাবতে থাকে তার অতীতকে।        

সময় মানুষের জীবনকে কত বদলে দেয়। মনে পড়ে একসময়ে মালা আর ফুলদের বাসা ছিল পাশাপাশি। প্রথমে পরিচয়,পরে বন্ধুত্ব। তারপর আরো কিছু। দুজন –দুজনকে ভালবাসতো নিবিড় করে গভীর ভাবে। স্কুলের সময় ছাড়া তারা একই সঙ্গে থাকতো। তারা যেমন সরল ছিল, সবাই তাদের সরল চোখেই দেখতো। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্ব গাঢ় হলো,ভালবাসা প্রেমে পরিণত হতে চললো। কিন্তু তাদের চারপাশ তাদের এই মেলামেশা আর সহজ ভাবে মেনে নিতে পারলো না। চারিদিক থেকে এলো বাধা। সব্বাই বললো, ‘পরিণাম খারাপ হবে। দুজনেই সরে পড়।’

মালার স্কুল জীবন সাঙ্গ হলো। বাধ্য হয়ে তাকে সরে পড়তে হলো। দুজনেই দুই শহরের কলেজে ভর্তি হলো। দুজনে দুজনের চোখের আড়াল হলো বটে,তবে মনের আড়াল হতে পারলো না। পরস্পরেরে আকর্ষণ প্রবল হলো। এরপর আরো বহু বাধা এসেছে। এমনকি পত্রালাপও বন্ধ হয়েছে। মনে পড়ে মালার শেষ চিঠির কথা। সে চিঠিটা সে ‘কাবুলীওয়ালা’-র মত সঙ্গেই রাখে। তার মানিব্যাগের ভেতর ওটা স্থান পেয়েছে। সেই চিঠিটা সে বের করে ফেললো। কম্পিত হস্তে সে খুলে ফেললো চিঠিটা। 

প্রিয় ফুল,

 তোমার চিঠি পেলাম। আর হ্য়তো তোমার লেখা আমার হস্তগত হবে না। তোমার চিঠি পেয়ে খুশী হয়েছি না দুঃখিত হয়েছি বলতে পারবো না। তোমার চিঠি না পেলেও শেষ বারের মতো এই চিঠি আমি লিখতাম। কিন্তু কি লিখবো বলতো? আজ যে আমার জীবনের চরম দিন উপস্থিত হয়েছে। এত যত্নে, এত সাধে গড়া সুখের জীবনের কল্পনা আজ মাটি হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে জগতের প্রতিটি পদার্থ এমনকি অপদার্থরাও আমাকে বিদ্রূপ করছে। আমি চলেছি যন্ত্রচালিতের ন্যায়, অনুভূতিহীন। আমার উপর চলছে সামরিক শাসন। হঠাৎ মানুষগুলো কেমন বদলে গেল। তাদেরকে বড় অচেনা মনে হচ্ছে আমার। কেউ আমার আপন নয়। তুমি বিশ্বাস করছো কিনা জানি না। 

তুমি লিখেছ,‘দীর্ঘকাল ধরে প্রতি মুহূর্তে ফুলে ফুলে যে মালা তুমি রচনা করেছ,সেটা ছিঁড়ে ফেল। নতুন করে মালা তৈরী করে তোমার প্রিয়তমের গলায় পরিয়ে দিও। মানাবে ভাল। আমাদের ফেলে আসা অতীতকে মনের কোণে ভিড় জমাতে দিও না। আর তাছাড়া আতীত এত বোকা নয়,সেও ভিড় করতে আসবে না। অর্থাৎ তার আর সেখানে ঠাঁই হবে না। সাবধানে থেকো। অতীত যদি মনের পর্দা উন্মোচন করে আসেও তাকে অতি গোপনে তাড়িয়ে দিও। প্রতিবাদ জানাবে না। আদর্শ গৃহিনী হও। তোমার প্রিয়তম ভাগ্যবান হউন।’


তুমি যা লিখেছ সেজন্য তোমাকে প্রতিঘাত করতে চাইনা। সমাজ সংসারের যে নিয়ম,তুমি তাই অনুসরণ করেছ। তুমি আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পার নাই বা চেষ্টাও কর নাই। তবুও জেনে রেখ, জীবনের প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিদিন তিলে তিলে সমস্ত অনুভূতি দিয়ে ‘ফুলে ফুলে যে মালা’আমি রচনা করেছি,সে মালা আমি তোমাকেই পরিয়ে দিয়েছি। সে মালা পাওয়ার মত ভাগ্যবান অন্য কেউ নেই। হয়তো ভাববে,নেহাৎ মেয়েলী মনের ক্ষণিকের আকুল আবেদন। কিন্তু জেনো আমার মন চিরকাল তোমার জন্যই উন্মুখ হয়ে থাকবে, হয়তো শেষ মিলনের জন্য। আর জেনো একটি মাত্র গ্লাসে সেই আয়তনের দু’গ্লাস জল ধরে না। তোমাকে আর কি বুঝাবো? আজ বাংলাদেশের মেয়েরা গৃহলক্ষী, খুব বাধ্য মেয়ে, একথাই প্রমাণ করতে যাচ্ছি। কিন্তু একটা কথা আছেনা, মেয়েরা ছলনাময়ী। আমি হব তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বলতে লজ্জা নেই, কেননা আমি করতে যাচ্ছি অভিনয়। কেবল অভিনয়। শুধু ফাঁকির বোঝা বয়ে বেড়াবো। অন্তরে অন্তরে পুড়ে ছাই হয়ে যাবো সেই চারুদত্ত আধারকারের মতো। আমি নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে চাই। তবে বিধাতার নিকট আমার প্রার্থনা আমি যেন জীবনের শেষ ক্ষণে তোমার সাক্ষাৎ পাই। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই।

এটাই আমার শেষ চিঠি। পরম লগ্ন তার বিভিষীকাময় আকুতি নিয়ে কঠিন হাতে লৌহ শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলার জন্য এগিয়ে আসছে। শেষবারের মতো ক্ষমা চাইছি। আর শেষবারের মতো তোমার জন্য রইলো – চিরকাল যা দিয়ে এসেছি – হৃদয় নিংড়ানো প্রীতি, বুক ভরা ভালবাসা। উপহাস করো না লক্ষীটি। তুমি সুখে থেকো ভালো থেকো।

                                  ইতি –  

                             তোমারই মালা

কুমুদিনী কলেজ,টাঙ্গাইল

০৫.০৪.১৯৫৯


Saturday, June 20, 2026

গল্প - কত অজানারে

 ফারাহ্‌ দিবা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। এম. এ. ফাইনাল দিবে। এই সময় একদিন রেডিওতে একটি বিশেষ ঘোষণা শুনতে পায়। সোমালিয়ান দস্যু কর্তৃক শ্রীলংকার বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাই। বুকটা কেঁপে উঠলো। কারণ এই জাহাজে ছয়জন বাঙ্গালী তরুণ অফিসার আছেন। তাদের মধ্যে একজন ইমরান। গত চারবছর ধরে সে তার অন্তরঙ্গ বন্ধু। কিংবা তার চাইতেও অধিক কিছু। সে একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে। তবে মেলামেশা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তার আশেপাশে।  

পারস্য উপসাগরকে লোকে গালফ্‌ বলেই জানে। সাধারণত এখানেই ভিনদেশি বাণিজ্য জাহাজগুলি জলদস্যু কবলিত হয়। কৃষ্ণকায়া সোমালিয়ান দুর্ধর্ষ দস্যুরা – যাদের  হাতে থাকে অতি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এ. কে.ফরটি সেভেন রাইফেল, তাদের সঙ্গে লড়াই করবার সাহস কারো নেই। মাত্র কয়েকজন জলদস্যু অনেক লোকজন সহ বিরাট বিরাট জাহাজ আটক করে ফেলে। আক্‌শি বাঁধা মোটা রশি জাহাজের উপরে বিশেষ কায়দায় ছুঁড়ে মারে।রাস্তা তৈরী হয়ে যায়। পরে গান পয়েন্ট তাক করে জাহাজের উপরে উঠে আসে। দিনের পর দিন জাহাজের লোকজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, খুন অনাহারে রাখা, পিপাসায় রাখা ইত্যাদি নানাবিধ অত্যাচার করে তাদের জীবন প্রদীপ নিবু নিবু পর্যায়ে নিয়ে আসে। জাহাজের ক্যাপ্টেন হয়ে পড়ে আসহায়। ক্যাপ্টেনের মাধ্যমে শুরু করে জাহাজের মালিকের সঙ্গে দর কষাকষি। জাহজ মালিক এক পর্যায়ে মোটা অংকের মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হয়।জিম্মিরা মুক্ত হয়। প্রানে রক্ষা পায় বটে, তবে জীবনের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।    

ফারাহ্‌ দিবা একা একা এই কষ্ট সহ্য করতে পারছিল না। একদিন বাসায় তার মনোবেদনার কথা প্রকাশ করে। সকলের সহমর্মিতা পায়। জাহাজ ছিনতাই এবং সংবাদ শোনার জন্য সকলে সর্বদা উৎকর্ণ হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখে মুক্তিপণ নিয়ে দরদাম হচ্ছে। শত কোটি মুদ্রা পেলে জলদস্যুরা জাহাজ ছেড়ে দেবে। সংকোচ পরিহার করে ফারাহ্‌ ইমরানদের বাসায় যোগাযোগ করে। তারাও ইমরানের জন্য গভীর ব্যাকুলতা প্রকাশ করে। কিন্তু কোন খবরই আসছে না। ফারাহ্‌ দিবার দিনরাত্রি প্রচন্ড যন্ত্রণায় অতিবাহিত হতে থাকে। সর্বদা ইমরানের দেওয়া আংটি তার অনামিকায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। কার্জন হলের পুকুরের শান বাঁধানো ঘাটে বসে একদিন চৈত্রের বিকেলের উতল হাওয়ায় মনের আনন্দে তারা দুজনে তাদের অংগুরীয় বদল করে ফেলেছিল। ইমরানের অনামিকার আংটি ফারাহ্‌র মধ্যমায় আর তার মধ্যমার আংটি, যার উপর এফ অক্ষর মিনা করা, ইমরানের অনামিকায় বদলী হয়ে গেল। দু’জনে একসংগে গেয়ে উঠলো –

  ‘ভালবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো তোমার মনের মন্দিরে/

  মনে ক'রে সখী, বাঁধিয়া রাখিয়ো আমার হাতের রাখী—তোমার কনককঙ্কণে॥’ 

গান শেষে ওরা বলেছিল, এই –ই ভাল। আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন কি? চল যাই চাংপাই। চাংপাই রেস্টুরেন্টে দুজনে মুখোমুখি বসে চায়নীজ খাদ্য উপভোগ করে তাদের অলিখিত বন্ধন পাকা করে নিয়েছিল। তারপর থেকে দেখা হলেই দুজনে আংটির সংঘর্ষ করে নিতো। মজা পেত খুব। ঐ পুকুর ঘাট ছিল তাদের বৃন্দাবন। 

পুকুরের জলে পা ডুবিয়ে মন্দ মধুর হাওয়ায় দোল খেয়ে, রবি ঠাকুরের গান গেয়ে, তাদের প্রণয় দৃঢ়তা লাভ করে। একজন বিহনে আরেক জনের জীবন অর্থহীন মনে হয়। সেই প্রিয় মানুষটি আজ দূরদেশে কোন্‌ সাগরের জলে দস্যু কবলিত। হায়রে অদৃষ্ট! মানুষের জীবনে দুর্ভোগ কত ভাবেই না আসে। একসময়ে শুকিয়ে যায় চোখের জল। দুই পরিবারে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। 

হঠাৎ একদিন রেডিও মারফত জানতে পারে শতকোটি টাকার বিনিময়ে জিম্মিরা মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু ইমরান ফিরে এলো না। কেউ তার খবর  দিতে পারলো না। সময় গড়িয়ে গেল। মাস গেল, বছর গেল। সংবাদ সংগ্রহের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। রেড ক্রসও কোন খবর দিতে পারলো না। হতাশাই দুই পরিবারের সম্বল হলো। 

ফারাহ্‌ দিবা চাকুরী করছিল কলেজে। তার মা –বাবা  মেয়ের জন্য  উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। মেয়েকে সংসার গ্রহণ করবার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। ‘মানুষ একা থাকতে পারে না। কার জন্য অপেক্ষা করছ? সময় থাকতে নিজের পথ দেখ। মানুষের  নিজের আশ্রয় এবং অবলম্বন থাকা উচিত।’

এদিকে একই কলেজে এক ভদ্রলোক চাকুরি করেন। জীব বিজ্ঞানের প্রফেসর। বড্ড গম্ভীর। তারও জীবনের ইতিহাস আছে। একটি মেয়েকে তার ও খুব পছন্দ ছিল। সদা হাসি খুশী টিংকু। রঙ্গিন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়ায়। ইকরাম স্যারকে তার খুব ভাল লাগে। স্যারকে সে বন্ধুর মতো মনে করে। চঞ্চল চপল টিংকু তার হৃদয় –মন জয় করে নিয়েছে। তবে সে চালাকও বটে। ইকরামের পক্ষপুটে থেকে অন্য ফুলের মধুও আহরণ করে। চেখে দেখে কোনটা বেশী মিষ্টি। তাদে সঙ্গে অভিসারে যায় সুন্দর সুন্দর স্পটে। ইকরামকে তার আনন্দের কথা, আহ্লাদের কথা কিছু কিছু বলে। ইকরাম তার সততার মূল্য দেয়। ভাবে মেয়েটি খুব সরল, ছেলে মানুষ!

একদিন হাসতে হাসতে টিংকু তার বিয়ের খবর জানায় ইকরামকে। বাবা –মার প্রচন্ড আগ্রহ উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। কারণ সে তাদের একমাত্র কন্যা সন্তান। ইকরাম লজ্জার মাথা খেয়ে বলে, পাত্র হিসেবে আমি কম কিসে? ত্বরিত উত্তর দেয় টিংকু। বাবা –মার অবাধ্য হওয়া যায় না। তবে আমি তোমারই থাকবো চিরকাল। এটা তুমি সত্য বলে জেনো। মানুষের অন্তরের প্রাপ্তিই আসল। এ বলে মায়া কান্না জুড়ে দিল। 

এই ছেলেটির কথা টিংকু অনেকবার বলেছে। এটা ছিল তার শেষ খেলা। কিন্তু তবুও ইকরাম ভয়ংকর মনোবিকলনের শিকার হয়। এ কলেজের চাকুরী ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কলিগরা তাকে বাধা প্রদান করে। বলে কোথায় যাবে তুমি? কার জন্য? মানুষ সব কিছু থেকে দূরে চলে যেতে পারে। কেবল পারে না নিজের কাছ থেকে দূরে থাকতে। সুতরাং কোথাও যাবে না। আমাদের কাছে থাক। কষ্ট শেয়ার করবার লোক পাবে। তোমার সংগে যা ঘটেছে তা পরোক্ষে ভালই হয়েছে। তোমার ঘরে যখন তোমার তথাকথিত প্রিয়া অন্য ফুলের মধু আহরণ করতো, তখন ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা দাঁড়াত। সবকিছুরই একটা অন্তরর্নিহিত মঙ্গল আছে। সুতরাং যেও না কোথাও, এখানে থাক। 

ইকরাম থেকে গেল। পরিচয় ছিল কলিগ হিসাবে ফারাহ্‌ দিবার সঙ্গে। গল্প  করতে করতে দুজন দুজনার জীবনের ট্র্যাজিডির কথা জানতে পারে। অন্যরা তো জানেই। তারা সকলে মিলে একদিন এই দুই ব্যক্তিকে ধরে বসে। বলে, আমাদের কলেজে কলিগদের মধ্যে কেউ একা নেই। কেবল তোমরা দুজনে সিঙ্গল। দুজনেই চূড়ান্ত ভাল মানুষ। এবার আর কোন কথা নয়। সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হও। উদ্বাহের বন্ধনের আয়োজন করি আমরা। শীঘ্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর। 

কয়েকদিন পর কলিগরা আবার টিফিন পিরিয়ডের ধূমায়িত চায়ের উপর তাদের মতামত জানতে চাইল। তাদের অধোবদন, হাসিমুখ। সকলে ধরে নিল মৌনতাই সম্মতির লক্ষণ। 

তারা দুই পরিবারের গার্জিয়ানদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিয়ের দিন তারিখ ধার্য্য করে ফেলল। ইকরাম আর ফারাহ্‌ দিবা পবিত্র সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ হলো। যাত্রা শুরু হলো একটি সুন্দর সাবলীল সংসারের। মানুষের জীবন একটাই। তাকে সার্থক  করে তুলতে হলে একজন আরেকজনের দুখের সুখের সঙ্গী হতে হবে। দু’জন পরস্পরকে গ্রহণ করতে হবে ‘ভাল মন্দ মিলায়ে সকলি।’ আনন্দ, উৎসব, অনুষ্ঠান সবই হলো প্রথানুযায়ী।

দিন চলে যায় নদীর স্রোতের প্রায়। ফারাহ্‌ দিবার দুটি ছেলেমেয়ে। তারা স্কুলে যায় । এমন সময় একদিন ফারাহ্‌ ডি. ভি. পেল। আমেরিকা যাওয়ার ছাড়পত্র। অনেক চিন্তা ভাবনা করে একদিন ওরা পাড়ি জমাল আমেরিকায়। ওরা যেহেতু শিক্ষিত, সেজন্য চাকুরী পেতে অসুবিধা হয়নি। ছেলে মেয়েদেরকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। দেশেও ওরা ইংলিশ মিডিউয়াম স্কুলে পড়াশুনা করছিল। 

বেশ কিছু বছর ওদের এভাবেই কেটে গেল। একবার একটি ভাল চাকুরীর সন্ধান পায় ফারাহ্‌। সব ফরমালিটি পুরা করে সামনা সামনি সাক্ষাত্‌কার দেবার প্রয়োজন পড়ে। ফারাহ্‌ দিবা হাজির হলো সে অফিসে। রিসেপশানে বসা লোকটিকে দেখে মনে হলো ভারতীয়। একটু পর মুখ তুলে লোকটি তাকিয়ে থাকলো ফারাহ্‌ দিবার দিকে। ফারাহ্‌ -ও বিস্ফারিত নেত্রে লোকটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো। হঠাত্‌ লোকটি ব্যগ্রস্বরে বলে উঠলো – তুমি? আমি ইমরান।

একটি সূক্ষ্ম যন্ত্রণা এতকাল পরে বক্ষমাঝে আর্তনাদ করে উঠলো। মনটাকে শক্ত করে বেঁধে দ্রুত অফিস কক্ষ হতে নিষ্ক্রান্ত হলো। মনে হলো আজ সে বড্ড ক্লান্ত। হৃদয় কন্দরে বেজে উঠলো সেই সুর –ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু...। 


উৎসর্গ -সপ্তর্ষি

  উৎসর্গ   আমার পিতাকে যাঁর জীবনের পাথেয় ছিল আপোষহীন নীতি আর শৃঙ্খলা ।   আমার মাতাকে ছেলেমেয়েদের মেধা ও মননশীলতায় যিনি ছিলেন নিব...