Saturday, March 28, 2026

প্রবন্ধ - দাস প্রথা উচ্ছেদ হয়েছে কি?

 


দাস প্রথা একটি প্রাচীন প্রথা। সেই সুদূর অতীত কাল থেকেই যারা স্বচ্ছল মানুষ, তারা সম্পদহীন মানুষের সেবা গ্রহণ করবার নিমিত্তে তাদেরকে দাস বানিয়ে রাখতো। শুধু তাই নয়, গরু ছাগলের মতো তাদেরকে, খোঁয়াড়ে রাখা হতো এবং শৃংখলিত অবস্থায় বাজারে বিক্রি করা হত। ক্রেতাগণ তাদের দাঁত দেখে, চোখ দেখে, হস্তপদ ঠিক আছে কিনা, অসুখ –বিসুখ আছে কিনা এইসব পরীক্ষা করে দরদাম করে ক্রয় করে বাড়িতে নিয়ে যেত। এরাই ক্রীতদাস। বংশ পরম্পরায় এই সকল দাসেরা অহর্নিশি তাদের মালিকদের খেদমতে নিয়োজিত থাকতো। সামান্য ত্রুটি –বিচ্যুতিতে তাদেরকে চাবুক দিয়ে বেদম প্রহার করতো। তাদের কোন বিশ্রাম ছিল না। নূন্যতম মানুষের মর্যাদা দেওয়া হতনা। জীবন্ত মানুষের অঙ্গ –প্রত্যঙ্গ কেটে ভিতরে কেমন আছে তা দেখতে দ্বিধা করতো না। হজরত রাবেয়া বসরী তার উদাহরণ।

সুদূর আফ্রিকা (কৃষ্ণ মহাদেশ/Dark continent) থেকে চতুর মার্কিনীরা কালো মানুষদেরকে ধরে নিয়ে যেত জাহাজ বোঝাই করে। ফাঁদ পেতে তাদেরকে ধরা হতো। এমনকি পশু পাখির মত জাল ফেলে  তাদেরকে ধরা হত। এটা একটা ব্যবসা ছিল তখনকার দিনে। 

দি রুটস্‌ ছবিটি দেখলে দাস প্রথার স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। ধনী ব্যক্তিরা দাসদের ঘাড়ে পা রেখে, তাদেরকে অত্যাচারে জর্জরিত করে নিজেরা আরামে, আয়াশে দিন কাটাতো। ক্রীতদাসরা বংশ পরম্পরায় তাদের সেবা করতো।

আমেরিকার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন একজন মহামানব ছিলেন। মানবতার এই অপমান, অমর্যাদা তার অন্তরকে ব্যথিত করে। তিনি আন্দোলনে নামেন। শেষে আমেরিকায় গৃহযুদ্ধ বাঁধে। প্রচন্ড যুদ্ধ হয় ক্রীতদাস প্রথার পক্ষে ও বিপক্ষে। তারপর গেটিসবার্গ এড্রেসে –১৮৬৩ সালের ১লা জানুয়ারি তিনি ঘোষণা করেন যে ক্রীতদাস রূপে যারা বন্দী রয়েছে, তারা এখন থেকে মুক্ত, স্বাধীন।

এতে ধনী সাদা মানুষেরা ক্রুদ্ধ হল। তাদের অন্তর থেকে কালো মানুষের শরীরের কালি কিছুতেই দূর হলো না। কৃষঙ্গরা তাদের দৃষ্টিতে কালো এবং ঘৃণ্যই রয়ে গেল। 

দাস প্রথা আজ নেই। বাজারে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য খোঁয়াড় নেই, ক্রয় বিক্রয় নেই। কিন্তু বাস্তবে প্রথা না থাক, দাসত্ব উচ্ছেদ হয় নাই। শ্রেণী প্রথা অর্থাৎ ধনী দরিদ্রের পার্থক্য অতিশয় প্রকটভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশে দরিদ্রের সেবা গ্রহনের প্রচলন খুবই আছে। স্বল্প মূল্যে তাদের শ্রম ক্রয় করে ধনী ব্যক্তিরা। সেই শ্রমলব্ধ ফসল বা উৎপাদিত পণ্য বা দ্রব্যাদি অধিক মূল্যে বিক্রি করে ধনীরা আরো ধনবান হয়। শ্রমদাতাগণ শ্রমিক নাম নিয়ে জীবন ধারণের কঠোর চেষ্টায় লিপ্ত হয়। 

কোথায় সভ্যতা, কোথায় আলো, কোথায় উন্নতি, তারা তার খোঁজ পায় না। রাজপথের সোডিয়াম বাতি আর হাজার গাড়ির বহর দেখে তারা অবাক বিস্ময়ে। রাত্রির কয়েক ঘণ্টা বিরতি বাদে বাকি সময়টুকু ওরা কারখানায় তথাকথিত ‘পোশাক শিল্পের’ ফ্যাক্টরিতে বন্দী থাকে। অনেক কারখানায় রাতেও ছুটি নেই। ওভার টাইম খাটায়। কিন্তু পারিশ্রমিক বাকী থাকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। শ্রমিকদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে না মালিকেরা। অশালীন সম্বোধন, অশ্লীল শব্দাবলীর ব্যবহার, এমনকি মারপিট করতেও দ্বিধা করে না। আর ছাটাইয়ের ভয়তো আছেই। যে বেতন পায় তা দিয়ে খেয়ে পরে বেঁচে থাকা বলে না। তাই তাদেরকে মানবেতর জীবন যাপনের গ্লানি বহন করে চলতে হয়। 

সাভারে মাত্র সেদিন ২৪শে এপ্রিল পোশাক কারখানায় হিরোশিমা, নাগাসাকির মত মুহূর্তে যে ঘটনা ঘটে গেল, তা সকলেই অবগত আছেন। এসব ঘটনা দাস প্রথাকে হার মানায়। দফায় দফায় অগ্নিকান্ড, বিল্ডিং ধসে যাওয়া নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা এ দেশে। এইসব শ্রমিকদের প্রাণ রক্ষায় বা স্বার্থ রক্ষায় কোন আইন নেই। মালিকেরা ধরা ছোঁয়ার  বাইরে থেকে যায়। কারণ তারা জানে কিছুদিন পরে এইসব মর্মান্তিক ঘটনার কথা মানুষ ভুলে যাবে। তাই তারা অনেকেই গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর ভিতরে সন্ধ্যার পর জরুরী মিটিং করার নামে বসে বসে আনন্দ, আড্ডায় মত্ত হয়, এবং কি করে আরো বেশী টাকা কামাই করতে পারবে এইসব হতদরিদ্র মানুষের রক্ত শোষণের বিনিময়ে সেই উপায় নির্ধারণের কৌশল আবিষ্কার করেন। 

এসব দেখে শুনে মনে হয় দাস প্রথা আজও সমাজে প্রচলিত আছে –পূর্বের চাইতে অধিক পরিমাণে আরো নিষ্ঠুর, আরো মর্মান্তিক ভাবে। দাস প্রথার অবসান হয়নি। মানুষ সরাসরি বাজারে বিক্রয় না হলেও, মানুষের ঘামেভেজা শ্রম বিক্রি হচ্ছে দিবা –রাত্রি!  

...


Saturday, March 21, 2026

প্রবন্ধ - রানা প্লাজা

 ২৪শে এপ্রিল। ২০১৩ সাল। সকাল ৯ ঘটিকার দিকে ঘটে এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা সাভারের রানা প্লাজায়। জরাজীর্ণ ৯ তলা ভবন। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ নেই। ভগ্ন পিলারগুলো তার ভার বহন করতে পারছিল না। কয়েক হাজার লোক তখন সেই গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে কাজে ব্যস্ত ছিল। বিকট শব্দ করে ধ্বসে পড়লো সেই বিল্ডিংটি। ৯টি ঢালাই করা ছাদ।একটির উপর আরেকটি পড়ে গেল, যেন পাউরুটির স্লাইস! নিহত হলো, আহত হলো, আটকা পড়লো কয়েক হাজার মানুষ! তাদের সেই আঘাত ও যন্ত্রণা বর্ণনা করবার ভাষা আমার জানা নেই। এই ভয়ঙ্কর মর্মান্তিক ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। পম্পাই –এর ভূমিকম্পের ঘটনা, উড়িষ্যার দ্বারভাঙ্গার ভূমিকম্পের প্রাকৃতিক মর্মস্পর্শী ঘটনাও যেন এর কাছে হার মানে।

উদ্ধারকর্মে যারা নিজের জীবন বাজি রেখে নিয়োজিত হয়েছিলেন তাদের সাহস ও মানবতাবোধ তুলনা রহিত। নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যারা আটকে পড়া শ্রমিকদেরকে উদ্ধার করেছেন তারা মনুষ্য সমাজে শ্রেষ্ঠ মানুষ। যারা দিনরাত একাকার করে সংবাদ পরিবেশন ও চিত্রধারণ করেছেন দেশের জনগণের জন্য তাদের তুলনা নেই। একেই বলে, ‘মানুষ মানুষের জন্য।’

দেশে দুর্ঘটনার অন্ত নেই। যদি রানা প্লাজার নিদারুণ ঘটনাবলী, ভগ্নস্তুপ, উদ্ধারকাজ, দৃশ্যাবলী, সংবাদ পরিবেশন, চলচ্চিত্র আকারে সংরক্ষিত হয় তবে এটি একটি জীবন্ত মহাট্র্যাজেডি রূপে সমগ্র পৃথিবীর মনুষ্যকে কাঁদাবে। এই হৃদয় বিদারক বাস্তব ঘটনা কল্প কাহিনীকেও হার মানায়। পরবর্তী প্রজন্মের মানুষেরা এই দৃশ্য দেখে সচকিত হবে। এরকম ভয়ংকর দুর্ঘটনা আর না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রাখবে এবং সচেতন থাকবে।

এই চলচ্চিত্র যদি প্রতি বৎসর ২৪শে এপ্রিল প্রচার করা হয়, তবে যারা মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেছেন, পেছনে ফেলে রেখে গেছেন তাদের চিরদুখী পরিবার, তারা এবং অন্য সকলে তাদের অকালে ঝরে যাওয়া আত্মার জন্য জন্য প্রার্থনা করতে পারেন। এই ঘটনাবলীর দৃশ্য প্রচার করে এ বিশ্বের তথাকথিত ধনী মানুষেরা যেন দরিদ্র জনগণের জীবন নিয়ে খেলা করতে না পারে, সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। 


Saturday, March 14, 2026

প্রবন্ধ - আমাদের হেলেন আপা


 বিদ্যাময়ী গার্লস’ হাই স্কুল। ময়মনসিংহের তথা সমগ্র বাংলাদেশের সেরা স্কুল। আমরা গর্ব বোধ করতাম বিদ্যাময়ী স্কুলের ছাত্রী ছিলাম বলে। সে সময় হেলেন আপাকে পাই আমাদের শিক্ষক হিসাবে। সবে মাত্র সপ্তম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছি। নতুন ক্লাসে নতুন আপাদের সাক্ষাৎ লাভ, সেটা একটা খুবই রোমাঞ্চকর ঘটনা। একটি মেয়ে বললো, এবার আমাদেরকে বাংলা পড়াবেন হেলেন আপা। শুনে চমকে উঠলাম। হেলেন আপা! যাকে দূর থেকে দেখেছি, ভয় পেয়েছি। তিনিই স্বয়ং আমাদের ক্লাস নেবেন। মেয়েটি বলল, কেন আমরা এখন বড় ক্লাসে পড়িনা?  আমরা তো প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রথম সোপানে পা রেখেছি। 

প্রথম বাংলা সাহিত্যের ক্লাসে হেলেন আপার আগমন। ক্ষণটি বেশ স্পষ্টই স্মৃতিতে ভাসে। প্রথম পিরিয়ডেই আপা আমাদের শ্রেণী কক্ষে প্রবেশ করলেন। যেন এক মহিয়সী নারী আমাদের সামনে উপস্থিত। আমরা সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যথাযথ অভিবাদন জানালাম। তিনি মেয়েদের নাম ও মেধার ভিত্তিতে পরিচয় জেনে নিলেন। তাঁর সৌন্দর্য, রুচিশীল পোশাক দেখে আমরা চমৎকৃত হলাম। তিনি বই খুলে একটি গল্প নির্বাচন করে আমাদেরকে পড়াতে শুরু করলেন। গল্পটির নাম ছিল ‘প্যারী নগরী’। হেলেন আপা তখন সদ্য বিলেত ফেরত। ইংল্যান্ডের ওপারেই ফরাসী দেশ। যার রাজধানীর নাম প্যারিস। হেলেন আপা সে দেশও ভ্রমন করে এসেছেন। প্যারিসকে সে দেশের লোকেরা প্যারি উচ্চারণ করে। হেলেন আপা স্বচক্ষে দেখে আসা পৃথিবীর সুন্দরতম শহরের বর্ণনা দিতে লাগলেন। যেন উনার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও সেই শহর ঘুরে ঘুরে দেখছি। বইয়ে যা কিছু লেখা আছে, তিনি তার সবকিছু দেখে এসেছেন। আমরা তাতে পুলকিত হয়েছি সবচেয়ে বেশী। ধাতু নির্মিত আইফেল টাওয়ারের কথা, শহরের স্থাপত্য শিল্পের কথা, রাস্তা ঘাটের কথা, প্রাচুর্যের কথা, সীন নদী  ও তার তীরভূমির নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্যের কথা –সব তিনি বর্ণনা করেছেন অতিশয় প্রাঞ্জল ভাষায়। তাঁর পাঠদানের পদ্ধতি ছিল খুব সুন্দর। উনার পড়াবার স্টাইল এত আকর্ষণীয় ছিল যে বাংলা গদ্য আর গদ্যময় মনে হতো না। পাঠদানের ফাঁকে ফাঁকে হেলেন আপার প্রাসংগিক জ্ঞানদান আমাদেরকে বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে সচেতন করে তুলেছে। আমরা বিস্মিত হলাম যে আপা কেবল বাহিরে নয়, অন্তরেও সুন্দর। পরিপূর্ণ একজন মানুষ ও দক্ষ শিক্ষক। তিনি নিজে সাহিত্য চর্চা করেন। তিনি বহু গ্রন্থের প্রণেতা। জীবন ও সমাজ সচেতন একজন লেখক। জীবন ও জগতের ঘাত প্রতিঘাত ও আনন্দ –বেদনার প্রতিচ্ছবি তার গল্পে, উপন্যাসে রূপায়িত করেছেন। তাঁর লেখা ‘আমার পরিচিত বৃহত্তর ময়মনসিংহের কয়েকজন বিশিষ্ট নারী’ –একটি বিশিষ্ট গ্রন্থ। এটি একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ বলে আমি মনে করি। তিনি যথেষ্ট শ্রম, মনোযোগ দিয়ে সাফল্যের সঙ্গে এই বইটি প্রকাশ করে একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ময়মনসিংহের তখনকার দিনের শিক্ষিত মেয়েদের জন্য এটি একটি ইতিহাসও বটে। বইটি একটি মহা মূল্যবান গ্রন্থ। তিনি আরো লিখুন এবং সুস্থ ও দীর্ঘজীবন লাভ করুন – এই আমার প্রার্থনা। একটি অনন্য প্রয়াসের জন্য হেলেন আপাকে আন্তরিক ধন্যবাদ  জানাই।

তারিখ – ২৭.১১.১৯৯৭ 

ঢাকা।

পরিশিষ্ট

হেলেন আপার দেখা পাইনি অনেকদিন। তার সাক্ষাৎ লাভের জন্য চেষ্টা করেছি অনেকবার। পরিচিত অনেককেই জিজ্ঞেস করেছি তিনি কোথায়? তারা বলেছেন, তিনি দেশে নাই। বিফল মনোরথ হয়ে আশায় আশায় দিন গুনেছি, যেদিন তিনি দেশে আসবেন সেদিন উনার সঙ্গে দেখা করতে যাব। কিন্তু আশা কুহকিনী। মার্চের একদিন পত্রিকা খুলে দেখি হেলেনা খান আর নেই। চলে গিয়েছেন প্রিয় মানুষজন, প্রিয় মাতৃভূমি ত্যাগ করে সেই পরপারে। আর একটিবারও ফিরে আসবেন না। এই যে আমি তোমাদের পরম প্রিয় হেলেন আপা ফিরে এসেছি, তোমাদের কাছে –এ কথাটি আর বলবেন না। ‘এ যে চলার পথ, ফেরার পথ নয়।’ 

পত্রিকায় সংবাদটি দেখে স্তব্ধ হয়ে রইলাম। একদৃষ্টে চেয়ে থাকলাম সেই ছবিটির পানে। আর তিনি কথা কইবেন না। কলমটি হাতে নেবেন না। লিখবেন না আমাদের জন্য। আমাদের মনের কথাটি আর বলবেন না –‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক। আমি তোমাদেরই লোক।’

কিন্তু তিনি সশরীরে না এলেও আছেন আমাদের মাঝে, থাকবেন আমাদের মাঝে –স্মৃতির মণিকোঠায়। বিদ্বান, বুদ্ধিমান, মমতাময়ী এবং একজন আদর্শ শিক্ষাদানকারী ও সুপথে চলার উপদেশ দানকারী হিসেবে আমাদের অন্তরে চির জাগরূক থাকবেন। তার অন্তর ছিল আলোকিত। তিনি সকল ছাত্রীদেরকে আলো দান করে গেছেন। তিনি উচ্চশিক্ষিত ছিলেন। সেই সময় খুব কম সংখ্যক মেয়ে সেই সুযোগ লাভ করেছিলেন। সেখান থেকেই তিনি শিক্ষার আলোর মশালটি পরবর্তী নারী শিক্ষা অর্জনের জন্য তুলে ধরেছিলেন। আমরা তাঁর ছাত্রী। অনেক প্রতিকূল অবস্থা অতিক্রম করে শিক্ষার আলোকে আলোকিত হয়েছিলাম। তাই তাঁর কথা আজ খুব মনে পড়ছে। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট লেখিকা। প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন। সমাজের এবং মেয়েদের অনেক সমস্যায় আলোকপাত করেছেন। শিক্ষত মেয়েদের সুস্থ চিন্তা ধারার দুয়ার খুলে দিয়েছেন। এগিয়ে চলার উৎসাহ দান করেছেন। 

আজ তিনি নেই। মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ থেকে কারো নিস্তার নেই। তবুও হৃদয় বীণায় তার চলে যাওয়ার বেদনার সুর বাজে। তার জন্ম সার্থক। জীবন সাফল্যময়। এটাই মানুষের জীবনের বেঁচে থাকার সার্থকতা। তাঁকে আমরা চিরকাল স্মরণ রাখবো আমাদের হৃদয়ের মণিমঞ্জুষায়।

‘জীবনের যাত্রাপথে 

কত অগণিত যাত্রীচলে

বিরাম, বিশ্রামহীন –

কেবা মনে রাখে?

তবু তারি মাঝে ক্ষণিক দাঁড়িয়ে 

স্মৃতির ফলকে

যারা পদচিহ্ন আঁকে,

তারা মনে থাকে।’

আমাদের হেলেন আপা ইহলোকে যেমন আলোকিত ছিলেন পরলোকেও সেরকম শান্তি লাভ করুন এবং পরম করুণাময়ের ক্ষমা ও দয়া প্রাপ্ত হউন। এই আমার প্রার্থনা।

০৪.০৭.২০১৯             


Saturday, March 7, 2026

প্রবন্ধ - ডুলি – প্রাচীন কালের বাহন

 


১৯৫৩ সাল। 

গ্রাম বাংলার গভীরে শিক্ষার আলো প্রবেশ করে নাই। লেখাপড়ার জন্য শহরে যেতে হত। শহরে যাবার পথ ছিল মেঠো পথ। বাড়ী থেকে রেল স্টেশন পাঁচ মাইল দূরে। হাঁটা একেবারেই সম্ভব নয়। পায়ে হাঁটা অপ্রশস্ত রাস্তা। তাই ডুলিতে চড়ে খুব ভোরে রওনা হয়ে ‘ধলা’ রেল স্টেশনে পৌঁছাতে হত। গন্তব্য বিদ্যাময়ী ইংরেজি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়,ময়নসিংহ। দেশের সেরা স্কুল যার ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে আমার প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন শুরু। 

আমাদের অঞ্চলে আমার পিতা –ই  একমাত্র শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন। কলিকাতা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১৯১৯ সালে এন্ট্রাস পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন যে বছরে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন সে বছরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। আমার পিতার স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা পাশ করার ফলে এলাকায় বিপুল সাড়া পড়ে যায়। একটি অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে একটি আলোর শিখা যেন প্রজ্জ্বলিত হয়। তিনি নান্দিনা মহারাণী হেমন্ত কুমারী উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। নান্দিনার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ও শিক্ষকদের  সঙ্গে তিনিও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তিনি একজন সুশিক্ষিত, তেজস্বী পুরুষ ছিলেন। নারী শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর গভীর আগ্রহ। তিনি গ্রামে আমাদের বাড়ি সংলগ্ন স্থানে একটি মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। আমার হাতে খড়ি আমার মায়ের কাছে। বাড়িতে যেহেতু লেখা পড়ার প্রচলন ছিল, সওগাত, মাসিক মোহাম্মদি, বেগম –এসব ম্যাগাজিন আমাদের বাড়িতে আসতো। আমার জন্য ছিল নানারকম বই। বাংলা, ইংরেজী, ঊর্দু, আরবী, ধারাপাত বই আরও অনেক আমার উপযোগী বই। মক্তবে আমার পড়াশুনা করার মত কিছু ছিলনা। সেজন্য মৌলবী (শিক্ষক) সাহেবের নির্দেশে লম্বা ঘোমটা টানা আট, নয় বছর বয়সের মেয়েদেরকে আমি পড়াতাম। শিক্ষক যেহেতু পুরুষ সেজন্য আমাকেই তাদেরকে পড়াতে হত। আমার পিতার উদ্দেশ্য ছিল আমাকে দেশের সেরা স্কুলে পড়াবেন। সেটি ছিল বিদ্যাময়ী স্কুল, ময়মনসিংহ। ১২ বৎসর না হলে হোস্টেলে সীট পাওয়া যায় না। তিনি তার আগেই ষষ্ঠ শ্রেণীতে আমার ভর্তির ব্যবস্থা করে ফেলেন। আমিই প্রথম ঐ অঞ্চলে, এই ডুলিতে চড়ে শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি । তখন মেয়েদের জন্য ছিল বাঁশের তৈরি ডুলি। স্থানীয় ভাষায় খাট। উৎসবের জন্য ছিল পালকি। কাঠের তৈরী, নকশাদার,ভারী,বড় আকারের। ঘাড়ে বহন করবার জন্য কাঠের দন্ড – কারুকাজ করা। ছয়জন বেহারা বহন করত। ডুলি বহন করতো দুই বেহারা।  ডুলি ছিল বাঁশের তৈরী চারকোণার একটি খাঁচা। যথেষ্ট শক্ত। ভেতরে একজন মানুষ সোজা হয়ে বসতে পারে। তার উপরিভাগে একটি শক্ত মোটা বাঁশ,বেশ লম্বা,যা কিনা বেশ শক্ত করে ঐ খাঁচাটিতে বাঁধা আছে। ছিঁড়ে  পড়ে যাবার কোন সম্ভাবনা নেই। বাহনটি ছিল মূলতঃ মেয়েদের জন্য। মহিলারা এত পথ হাঁটতে পারেনা। কারণ তাদের কোলে থাকে শিশু এবং পর্দা রক্ষারও একটি ব্যাপার আছে। ডুলি একটি শাড়ি বা অন্য যে কোন কাপড় দিয়ে ঘেরা থাকতো। যাত্রী মহিলাটির সঙ্গী বা প্রহরীর পা দু’খানাই সম্বল। বেহারাদের সঙ্গে সে দ্রুত পদসঞ্চারণে পথ চলতো। 

বেহারা, যারা ডুলি বা পালকি বহন করতো তাদেরকে আমরা স্থানীয় ভাষায় ‘মাড়োয়া’ বলতাম। বেহারারা ছিল উড়িয়া। হিন্দি –উর্দু মিশ্রণে একরকম বিচিত্র সুরে কথা বলতো। তাদের গাত্রবর্ণ কৃষ্ণবর্ণও নয়,ফর্সাও নয়। বেশ উঁচা লম্বা গড়ন। মালকোঁচা দেওয়া ধুতি খাটো করে পরা। তাদের সঙ্গে কখনও তাদের পরিবার দেখি নাই। সম্ভবতঃ তারা নিজেদের দেশ হিন্দুস্থানে নিজেদের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতো। আমাদের এদিকে তারা সাধারণতঃ ধনী বাড়ির দিঘির চওড়া পাড়ে ঘর তৈরী করে বসবাস করতো। তারা সবসময়ে দলবদ্ধ হয়ে বাস করতো। অনেকে অনেক সময়ে হাট বাজারের উপকন্ঠে আশ্রয় কেন্দ্র তৈরী করে থাকতো। তাদের দলে একজন সর্দার থাকতো। আমাদের বাড়ির কাছের দলের সর্দারের নাম ছিল ‘আঁউতার’। ছাতু ছিল তাদের প্রিয় খাদ্য। ভাত, রুটিও খেত। আমরা বাঙালীরা সেই সময়ে আটার রুটি চিনতাম না। শুকনো তামাক পাতা হাতের তালুতে কচলিয়ে পাউডার করে মুখের ভেতরে মাড়ির ফাঁকে দিয়ে রাখত। সেটাকে বলা হত ‘খইনি।’ অবসরে বৃক্ষ ছায়ায় বসে তারা খইনি বানাত। কোন সঙ্গী সাথী আসলে তারা তদের নিজেদের ভাষায় জিজ্ঞেস করতো, 

'কা  -হো? (কি কর?) 

খইনি খা –ল –বা ? (খইনি খাবা?)

সওয়ারি বহন করাই ছিল বেহারা বা মাউরাদের একমাত্র কাজ। গ্রাম –গ্রামান্তরে তারা সারাদিন সাওয়ারী বহন করতো। যাত্রী অবশ্যই মহিলা। ডুলি একাধিক যাত্রী বহন করবার উপযুক্ত বাহন নয়। তবে পালকিতে দু’জন বসতে পারতো,যেমন বর –কনে। সেক্ষেত্রে ছয়জন বেহারা থাকতো। হাতে লাঠি। স্কন্ধে গামছা। বেহারাদের পারশ্রমিক ছিল শুকনো খাবার চাউল,চিড়া,মুড়ি,গুড়।   

চলার পথে দ্রুত পদচারনার সাথে সাথে বেহারারা একরকম শব্দ করতো –হুঁম্‌, হুঁম্‌, হুঁম,... একই তালে, একই ছন্দে । দুই বেহারা এগিয়ে চলতো একই তালে একই সুরে। হয়তো এতে তাদের শক্তি বৃদ্ধি পেত। ভারি বস্তু বহন করবার সময় একটু দৌড়ের প্রয়োজন হয়। তাতে মাল বহন করা এবং গন্তব্যে পৌঁছা সহজতর হয়।

স্টেশনে পৌঁছালে ঝিক ঝিক শব্দ করে রেলগাড়ী আসতো। বেহারাদের পায়ের গতি বৃদ্ধি পেত। আমি তখন ছোট একজন সওয়ারি। দুই বেহারা নৃত্যের তালে তালে অপেক্ষাকৃত কম সময়ের মধ্যে ধলা স্টেশনের নিকটবর্তী হত। একদিকে মায়ের জন্য কান্না, ছায়া সুনিবিড় গ্রামের জন্য বেদনা বোধ, অন্যদিকে পথের পাঁচালীর অপু দুর্গার মত রেলগাড়ি দেখার কৌতূহল আমাকে আন্দোলিত করত। রেলগাড়ি গফরগাঁও স্টেশন ছেড়ে আসার পর পরেই তার হুইসেল এবং শব্দ শোনা যেত। রেল লাইনের ওপারে স্টেশন। ট্রেনের ভারে রেল লাইনেও এক রকম কম্পন অনুভূত হত। আমার বাহন ডুলিও এসে থামতো। এসব স্টেশনে ট্রেন কখনও পূর্ণ বিরতি নেয় না। গতি কম করে মাত্র। আমার ভাইয়েরা আমাকে ডুলি থেকে টেনে বের করে ট্রেনের ‘জেনানা’লেখা কামরায় ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিত। বেহারা, ডুলি আবৃত করে রাখা শাড়িটি খুলে দ্রুত কামরার জানালা দিয়ে ভিতরে ছুঁড়ে দিত। তারপর আমার ভাইয়েরা দ্রুত পাশের কামরায় উঠে পড়তেন ট্রাঙ্ক, স্যুটকেস, বেডিং নিয়ে। দুই বেহারাকে আট আনা অর্থাৎ ৫০পয়সা দিতেন। কুলিকে দিতেন ২৫ পয়সা। ট্রেনের গতি বৃদ্ধি পেত। ট্রেনের কামরায় মাত্র কয়েকজন যাত্রী থাকত –অবশ্যই মহিলা। ব্যক্তিগত গল্পে তাদের সময় কেটে যেত, যেন তারা কত কালের পরিচিত। গল্প গুজব, পান কিমাম খাওয়ার আদান প্রদানে যত ব্যক্তিগত, পারিবারিক – সব গল্প চলতে থাকতো। আমি রেলগাড়ির ভেতরের চেহারা দেখতাম, আরো দেখতাম বাইরের সব গাছ –পালা, মাঠ –ঘাট, ক্ষেত –খামার উল্টো দিকে দৌড়াচ্ছে। দেখে স্তম্ভিত হতাম। কি কারণে উল্টো দিকে দৌড়াচ্ছে তার কোন কারণ বোধগম্য হতো না। 

ডুলি প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলতে হয়। আমার আম্মা তাঁর ছোট বেলায় লাখ্‌নৌ-তে থাকতেন তাঁর ভাইদের সঙ্গে। তিনি বলেছেন,লাখ্‌নৌ শহরের অলিগলি ভরা ছিল  ডুলিতে। এখনকার সময়ে আমাদের দেশের রিকশার মত। যার যখন দরকার ডুলিকে ডেকে নিত এই বলে,'ও ডোলি ওয়ালা,ইধার আও।'ধনী লোকেরা ঘোড়ার গাড়িতে যাতায়াত করতেন। তখন সময় ১৯২০ থেকে ১৯২৬ সাল। অন্য কোন যানবাহন সে সময়ে ওনাদের চোখে পড়েনি। আজকের এই একবিংশ শতাব্দী থেকে সেই সময় কত দূরে!

...


উৎসর্গ -সপ্তর্ষি

  উৎসর্গ   আমার পিতাকে যাঁর জীবনের পাথেয় ছিল আপোষহীন নীতি আর শৃঙ্খলা ।   আমার মাতাকে ছেলেমেয়েদের মেধা ও মননশীলতায় যিনি ছিলেন নিব...